শনিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১২

ফিরে দেখা ২০১২

বছর শেষে পিছন ফিরে তাকাতে গিয়ে প্রথমেই মনের পরদায় ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া কাছের মানুষ, প্রিয় মানুষগুলোর মুখ। মনে পড়ে কত কথা। কত স্মৃতি। একটা হু-হু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক ভেদ করে। ভাবি, এই তো ছিলাম এক সঙ্গে... কথা বলেছি, হাসি-ঠাট্টায় মেতেছি, দুঃখ-অভিমানও করেছি। কখনও মনে হয়নি বিচ্ছেদ ঘটবে তাঁদের সঙ্গে, কিন্তু সত্যিই তো চোখের আড়াল হয়েছেন রাজনীতিবিদ শামসুর রহমান খান শাহজাহান (২রা জানুয়ারি), ছড়াকার-সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ (২০শে ফেব্রুয়ারি), সাংবাদিক বাহাউদ্দিন চৌধুরী (১৬ই মে), কবি কবিরুল ইসলাম ও জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ (১৯শে জুলাই), কথাশিল্পী সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ (৪ঠা সেপ্টেম্বর), সাংবাদিক আতাউস সামাদ (২৬শে সেপটেম্বর), কবি বাসুদেব দেব (৯ই অক্টোবর), বহুমাত্রিক লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (২৩শে অক্টোবর), চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত (১৬ই নভেম্বর), কবি অর্ধেন্দু চক্রবর্তী (২৫শে নভেম্বর)... আরও কত ভাললাগা মানুষ। এ পর্যন্ত লিখতেই খবর এলো আরও এক প্রিয় শিল্পীর চিরবিদায়ের খবর। নজরুলগীতির নন্দিত গায়ক সোহরাব হোসেন আর নেই (২৭শে ডিসেম্বর)। খবরটা শুনতেই কানে ভেসে আসে তাঁর মধুকণ্ঠের গান। মনে পড়ে সংগীত জগতের আরও দুই নক্ষত্রকে হারিয়েছি এই বিদায়ী বছরে। সুরকার-সংগীত পরিচালক রবি (৭ই মার্চ) ও মেহেদি হাসান (১৩ই জুন)-এর কথা বলছি। তারা হারালেও তাদের গান কি হারাবে কখনও? না। আমাদের হারিয়ে যাওয়ার পরেও তাদের গান থেকে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এখানে যাদের কথা বললাম এরা সকলেই কৃতিত্বে কীর্তিতে অমর হয়ে থাকবেন সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে। তাদের মনে রাখবে দেশ, সম্মান শ্রদ্ধা জানাবে আন্তর্জাতিক বিদগ্ধ মহল। তবে আমি আরও দু’জনকে আজ স্মরণ করতে চাই বিশেষ করে। তারা খ্যাতিমান কেউ নন, বরণীয় স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব নন, হতেও চাননি... সাধারণ মানুষের মতোই বেঁচে থেকে নীরবে চলে গেছেন এই বিদায়ী বছরে। তবে চরিত্রে অসাধারণত্ব ছিল তাদের। যথাসময়ে যথাভূমিকা রাখার মতো মহিমাও ছিল। সে প্রমাণ রেখেছেন তারা। তখন বড় দুঃসময়। উনিশ শ’ একাত্তর। হানাদার পাকিবাহিনীর হত্যাবিভীষিকা দেশজুড়ে। তাদের দোসর ঘাতক দালালদের রক্তচক্ষু আরও ভয়ঙ্কর। অবরুদ্ধ শহরে উদ্যত সঙ্গীনের নিচে জীবন। যখন তখন হুমকিধমকি, ধরপাকড়, খুনজখম। হঠাৎ করে হামলা, পাকড়াও। তারপর বন্দিশিবিরে বধ্যশিবিরে নৃশংস মৃত্যু। কেউ কোনও মতে ধুঁকে-ধুঁকে প্রাণটা নিয়ে ফিরে আসে নানা তদবির, কাকুতি-মিনতি, অনুনয়-বিনয়, ক্ষমাভিক্ষা করে... কিন্তু ফেরে না অনেকেই। আটক হয়ে, নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়ে, ক্ষতবিক্ষত দেহে, চরম লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ও অপমান-অসম্মানের মধ্যে তখন অবরুদ্ধ শহর টাঙ্গাইলে চরম পরিণতির প্রতীক্ষা করছি আমরা- গোলাম আম্বিয়া নূরী, আখতার বোখারী, আনোয়ার বখশ, মোয়াজ্জেম হোসেন, এস এম রেজা, আবদুর রহমান রক্কু, নূরুন্নবী মাস্টার, খন্দকার বাবুল চৌধুরী, আমি ও আরও ক’জন। এদের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন আনোয়ার বখশ (এখন আওয়ামীলীগের নেতা) ও মোয়াজ্জেম হোসেন (প্রয়াত), ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন এস এম রেজা (প্রয়াত) ও আবদুর রহমান রক্কু (পরে খ্যাতিমান নাট্যজন, প্রয়াত), শিবনাথ হাইস্কুলের শিক্ষক নূরুন্নবী মাস্টার ছিলেন ন্যাপ-নেতা। গোলাম আম্বিয়া নূরী এখন খ্যাতিমান নাট্যকার, খন্দকার বাবুল চৌধুরী বিএনপি’র নেতা। শহরে তখন প্রায়ই চোরাগোপ্তা অপারেশন চলে কাদেরিয়া বাহিনীর। এক-একটি অপারেশনের পর পাকিরা পাকড়াও করে কয়েকজন করে কিশোর-তরুণকে, চলে অত্যাচার-নির্যাতন, হত্যাও। কিন্তু বন্ধ হয় না অপারেশন। তখন পাকিরা বলে, পাড়ায়-পাড়ায় পাহারা দাও। কোনও বোমা যেন না ফাটে, গুলি যেন না চলে। চললেই তোমাদের কল্লা ঘ্যাচাং। ওই সময় আমাদের আকুরটাকুর পাড়ায় অসীম সাহস ও ঝুঁকি নিয়ে যারা রাত জেগে পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন তাদের একজন আমার প্রতিবেশী খাজা মিঞা। আমি ডাকতাম খাজা কাকা বা খাজাক্কা বলে। পাড়ার কিশোর তরুণ যুবকদের তিনি একত্রিত করেছিলেন এ কাজে। সে তরুণদের একজন আলমগীর। আমার কলেজ-জীবনের বন্ধু জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই, স্বাধীনতার পর আমার ছাত্র। রেজাউল হাসান বাবুল (সাংবাদিক, বর্তমানে মার্কিন প্রবাসী), ইকবাল হাসান (স্বাধীনতার পর গুম) এবং আরও অনেকের সঙ্গে তারা দু’জন সময়োপযোগী ভূমিকা রাখায় সেই মৃত্যুভয়াল দুঃসময়ে আর কোনও মৃত্যু হানা দেয়নি আমাদের পাড়ায়। এ কৌশল পরে অন্যান্য পাড়াও গ্রহণ করে সমর্থ হয় আত্মরক্ষায়। ফলে শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের আসা-যাওয়া, আশ্রয় নেয়া, খবর সংগ্রহ, অপারেশন চালানো সহজ হয় অনেকখানি। বিদায়ী বছরে হারিয়েছি প্রিয় খাজাক্কাকে, স্নেহের আলমগীরকে। বিপদে পাশে থাকার ভূমিকা নিয়ে তারা যে অবদান রেখেছেন তা যেন পাড়ার আমরা কেউ ভুলে না যাই কখনও। একাত্তরের আক্রান্ত জনপদে আরও অনেকে নিশ্চয়ই এমন মমতাময় ভূমিকা রেখেছেন তাদের মতো। তাদেরও স্মরণ করি আজ।
sazzadqadir@gmail.com

বৃহস্পতিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১২

লাভ কি সরকারের?

সরকার আসে, যায়। নতুন সরকার গালমন্দ করে অতীত সরকারকে। আগামী সরকারও গালমন্দ করবে এ সরকারকে। তাঁরা সরকারি কাজ বলে যে সব দরকারি কাজ করেন তাতে হেরফের হয় না তেমন কিছু। রঙ বদলায়, চেহারা বদলায়, আওয়াজ বদলায় - এই যা। সেই ষাটের দশক থেকে দেখে আসছি, দেখছি এখনও। নিশ্চিত জানি, আমাদের পরের প্রজন্মগুলোও দেখে যাবে এ সবই।
    সরকারি দলের প্রথম কাজ দলীয়করণ। দলের লোক ছাড়া তাঁদের আদর্শ উদ্দেশ্য লক্ষ্য কর্মসূচি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলেই এটা খুব জরুরি। তবে বিরোধী দলে থাকাকালে প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা, বিচার, শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিভাগে নিরপেক্ষতা এবং বেতার-টিভি, একাডেমি, ইনস্টিটিউট প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে স্বায়ত্তশাসন দাবি করলেও সরকার গঠনের পর ওগুলোতেই শুরু হয় সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপ। দেয়া হয় দলীয় ও অন্যবিধ বিবেচনায় নিয়োগ। যাচাই হয় না প্রকৃত দক্ষতা ও যোগ্যতা। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সুপরিচিত ও মেধাবী ব্যক্তি। সেখানে প্রধান বিবেচ্য আনুগত্য, তদবির, কানেকশন ও অন্যান্য লেনদেন। এ সব কারণে সরকারি বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম কিভাবে কি চলছে তা জানেন সবাই। ‘সরকারি মাল দরিয়া মে ডাল’ কথাটা তো সেই আদ্যিকাল থেকেই চালু - এখন বেপরোয়া দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থার কারণে প্রতিদিনই বেড়ে চলে সরকারের বিপুল সুখ্যাতি। বেতার-টিভি ও অন্যান্য প্রচার-প্রকাশ প্রতিষ্ঠানে দলের লোকজন দু’ হাত খুলে লেখে, গলা ফাটিয়ে চেঁচায়, দিন-রাত বক-বক করে - কেউ শোনে না, দেখে না, পড়ে না ও সব, বিশ্বাসও করে না। বরং ভাবে, সরকারের কি লাভ এ সব করে?
    বলা হয়, বিচারক শিক্ষক শিল্পী সাহিত্যিক সাংবাদিক পুলিশ দলীয় হয়ে গেলে দেশের মানুষের দাঁড়াবার জায়গা থাকে না আর। সব দলই বলে এ কথা। সরকারে যাওয়ার পরেও বলে। কিন্তু করে কি কাজটা?
    দুর্মুখেরা বলে, সরকারি দল যত ভাল কথা বলে তত খারাপ কাজ করে। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিকতা নিয়ে চাপাবাজি করে শত মুখে, কিন্তু তাদের দলেই নেই গণতন্ত্র। ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে বসে থাকে, কিন্তু ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না কোথাও। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথায় মুখে ফেনা উঠে যায় নেতাদের, কিন্তু সরকারের প্রেসনোট, বিবরণী, বিবৃতি, বিজ্ঞপ্তি, ভাষ্য বিশ্বাস করে না কেউ। মিথ্যাচার, ধামাচাপা, আড়াল করা, এড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদিতে তাঁদের জুড়ি মেলা ভার। চাঁদাবাজি, লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুনোখুনি ইত্যাদিতে দলের লোক জড়িত থাকলে সরকারের মুখ দিয়ে কি সব কথা বেড়ায় তা সকলেরই প্রায় মুখস্থ। টেলিভিশনে সে সব গৎবাঁধা কথার সঙ্গে মিলিয়ে কথা বলতে পারেন দর্শকেরা। অনেক দর্শক পারেন আগে-আগে বলতে। প্রথমত বলা হবে, ‘এখনও জানি না, জেনে বলবো।’ এর পর বলা হবে, ‘রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে, রিপোর্ট আসে নি এখনও।’ পরে বলা হবে, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন কিছু বলা যাবে না, এতে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। তাই বলে বলা-কওয়া থামবে না একটুও। পুলিশ বলবে, দুষ্কর্মের জন্য কারা দায়ী জানা যায় নি তা। প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশেরা বলবে, চিনতে পারি নি দুর্বৃত্তদের। মামলা হবে আসামিদের অজ্ঞাত উল্লেখ করে। ফরেনসিক ডাক্তার বলবেন, হত্যা নয় আত্মহত্যা বা অন্য কিছু। মন্ত্রী বলবেন, আমাদের দলের কেউ নয় ওরা। অনুপ্রবেশকারী। নাশকতাবাদী। ওদিকে মিডিয়ায় জানাজানি হয়ে গেছে সব। ভিডিও ফুটেজে, ছবিতে শনাক্ত হয়েছে অপরাধীদের নাম ধাম পরিচয়। কিন্তু সরকারের কাছে তারা অনুপ্রবেশকারী এজেন্ট। কিন্তু কোন দলে ‘কনভার্ট’ নেই? ‘স্টলওয়ার্ট’দেরই বরং খোঁজ মেলে না বড়-বড় দলে। প্রায়ই তো অমুক দলের অত জনের অমুক দলে যোগদানের সচিত্র খবর পড়ি পত্রিকায়। সেখানে একটি বিচিত্র ব্যাপার দেখতে পাই প্রায়ই। যোগদানকারীদের যেখানে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়ার কথা, সেখানে তাঁরাই ফুলের বিশাল তোড়া-গুচ্ছ নিয়ে এসে তুলে দেন নেতা-নেত্রীদের হাতে।
    সরকারের চিরশত্রু মিডিয়া। আর বিরোধীরা তো আছেই। তাদের বিরোধিতা সরকারের কাছে সরকার-বিরোধিতা নয়, দেশ জাতি সমাজের বিরোধিতা। এমনকি দেশদ্রোহ, রাষ্ট্রদ্রোহ। তবে অনুগত বিরোধীও আছে। প্রয়োজনে তাদের মাঠে নামায় সরকার। নানা কর্মসূচি পালন করায় নানা উদ্দেশ্য হাসিলের মতলবে। তাদের সহযোগিতা সহায়তা পৃষ্ঠপোষকতা করে সর্বতোভাবে। নিজেদের কোলে ঝোল টানার জন্য এ রকম আরও অনেক কাজ সরকারি দলগুলো করে আসছে জেনেশুনেই। কিন্তু পাবলিক সবজান্তা হলেও যে প্রশ্নের উত্তর জানে না তা হলো,  ‘এ সব করে লাভ কি সরকারের?’
sazzadqadir@gmail.com

শনিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১২

বিজয়ের সুফল, হিসাবের পাওনা

পালন-উদযাপনের জন্য উপলক্ষ আছে আমাদের অনেক। উৎসব, দিবস, মাস আছে বছর জুড়ে। ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসব আছে। আন্তর্জাতিক, জাতীয়, স্থানীয়, আঞ্চলিক দিবস আছে। তবে পালন-উদযাপনের মাস সবই আমাদের নিজস্ব। জাতীয়। ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস, মার্চ স্বাধীনতার মাস, আগস্ট শোকের মাস, ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। শোকের মাসে দলীয় প্রাধান্য থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তা নিয়ে বিতর্ক নেই কোনও। এসব উপলক্ষ-আয়োজন নিয়ে বিশ্বের সর্বত্র যা হয় আমরাও ব্যতিক্রম নই তার। আনুষ্ঠানিকতা ক্রমে ক্রমে গ্রাস করে এই স্মৃতিবাহী ঐতিহ্যগুলোকে। দেখা দেয় প্রাণহীন অন্তঃসারশূন্য অনুষ্ঠানসর্বস্বতা। বাড়ে দায়সারাভাবে পালনের প্রবণতা। বেদনা বা উচ্ছ্বাস সবই যেন হয়ে পড়ে কৃত্রিম। লোকদেখানো। মতলবি। তবে উদ্যোগ-আয়োজনে খামতি থাকে না মিডিয়ার কল্যাণে। তারা পাল্লা দিয়ে নেমে পড়ে সরব সোচ্চার প্রতিযোগিতায়। মাতে জমজমাট জৌলুষে জমকালো জেল্লাইয়ে। নেপথ্যে থাকে প্রচার-বিজ্ঞাপনের ইঁদুরদৌড়। থাকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা ব্যবসায়িক কামাই-কৌশল। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তির ধুন্ধুমার লড়াই চলে ক্ষমতাবলয়ে। সুবিধা পেতে কে কাকে ল্যাং মেরে এগিয়ে যাবে এই সুযোগে - সে কোন্দল-কাড়াকাড়িও হয়ে ওঠে বিকট বিটকেল। তখন দেখি ভক্তির চেয়ে আড়ম্বর বেশি, কীর্তির চেয়ে কীর্তন অধিক, শাসনের চেয়ে ভাষণ ভূরি-ভূরি, কাব্যের চেয়ে বাক্য অজস্র। ভাষার মাসে অনেক ভাষণ শোনা যায় - কিন্তু অশিক্ষা-কুশিক্ষার প্রভাবে ভাষার যে বিকৃতি চলছে, সাহিত্য যে সস্তা হয়ে উঠছে সে কথা বলেন না কেউ। শিল্প-সাহিত্যের কাজ যেন স্রোতে ভাসা - এটাই যেন ভাষার মাসের শিক্ষা। একই ভাবে স্বাধীনতা ও বিজয়ের মাসে স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুফল ঘরে-ঘরে পৌঁছে দেয়ার কথা বললেও তা নিজেদের ঘরে-ঘরে তোলার আয়োজনই দেখা যায় সর্বত্র। তখন দেখেছি ভূয়াদের দৌরাত্ম্য, এখন দেখছি ধূর্ত ধান্দাবাজদের দাপট। তাহলেও এসব উৎসবের মাহাত্ম্য, দিবসের তাৎপর্য, মাসের মহিমা এখনও ম্লান হয়ে যায়নি একেবারে, এখনও তা আনন্দ ও প্রত্যাশার আলো হয়ে আছে আমাদের জীবনে। তাই একুশ এলেই জেগে উঠি মাথা নত না করার আহ্বানে, মার্চে গৌরব করি ত্যাগ-তিতিক্ষায় স্বপ্ন-সাধনায় পাওয়া স্বাধীনতার, শোকের আগস্টে দেখি শক্তি সঞ্চয়ের জাগরণ, বিজয়ের আনন্দে দেখি বীরের রক্তস্রোত আর মায়ের অশ্রুস্রোতের ছবি। তাই বলি, এত হত্যা, লুণ্ঠন, ধ্বংস, অত্যাচার-নির্যাতনের পর পাওয়া এই বিজয়কে যেন ভুলে না যাই এই বিজয়ের মাসে, যেন মনে থাকে সে সব রক্তক্ষয়ী যুদ্ধদিনের কথা। যারা লড়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন, নিপীড়ন সয়েছেন, লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হয়েছেন - তাদের যেন স্মরণ করি। বিজয়ের সুফল এখনও ভাগ করে নেয়া বাকি। এখনও হিসাবের পাওনা পায়নি নিরানব্বই জন। আজও পথে-ফুটপাথে দেখি নিরাশ্রয় মানুষ, রাত জেগে শুনি ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না। আজও নারীরা নিয়ত নির্যাতনের শিকার, প্রকাশ্যে চলে লুটেরা-সন্ত্রাসীদের উল্লাস-নৃত্য, দুর্নীতি ক্রমশ বেপরোয়া, অনৈতিকতা দিনে দিনে উদ্ধত ও দুর্বিনীত। প্রশ্ন জাগে, বিজয়ের সুফল কি তবে এই?

sazzadqadir@rediffmail.com

বৃহস্পতিবার, ২২ নভেম্বর, ২০১২

‘সর্বশক্তিমান যোদ্ধা’

আসল নাম একটা থাকে সকলেরই, তারপরও থাকে আরও নাম। লেখক-নাম, ছদ্মনাম, তারকা-নাম। তাই শেখ আজিজুর রহমান হন শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান হন মৈনাক, ঝরনা বসাক হন শবনম। এছাড়া বিয়ে বা ধর্মীয় বা সাংগঠনিক কারণে নাম বদলে যায় অনেকের। বিশেষ করে বিয়ের পর অনেক মহিলা তাঁর স্বামীর নাম বা উপাধি যুক্ত করেন নিজের নামের সঙ্গে। এভাবেই হয়েছে ‘সুফিয়া এন হোসেন’ ও ‘সুফিয়া কামাল’ নাম। অনেকে পিতার নাম বা উপাধিও রেখে দেন নামে। যেমন, শেখ হাসিনা ওয়াজেদ। তবে আমি অন্তত একজন পুরুষকে জানি তিনি স্ত্রীর নাম যুক্ত করেছেন নিজের নামের সঙ্গে। সন্তানের নামের সঙ্গে পিতার নাম বা উপাধিই যুক্ত হয় সাধারণত। অনেকে যুক্ত করেন মায়ের নামও। যেমন, বিখ্যাত সাংবাদিক ও বৃটিশ কমিউনিস্ট পারটি’র তাত্ত্বিক রজনী পাম দত্ত (১৮৯৬-১৯৭৪)। তাঁর পিতার নাম উপেন্দ্র দত্ত, মায়ের নাম আনা পাম। এ রকম আরও উদাহরণ ড্যানিয়েল ডে-লুইস, হেলেনা বনহ্যাম-কারটার, সঞ্জয় লীলা বনশালি। সন্ন্যাস বা অন্য কোনও ব্রত গ্রহণের কারণে নতুন নাম রাখা হয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ে। যেমন, বীরেশ্বর তথা নরেন্দ্রনাথ দত্ত হয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। মিস মারগারেট নোবল হয়েছেন ভগিনী নিবেদিতা।
    তবে অনেকের নামের আগেও থাকে বিশেষ এক নাম। রাজনীতিক, সাহিত্যিক, বিনোদন-তারকা প্রমুখের ক্ষেত্রে তা হয়ে ওঠে উপাধির মতো। আসল নাম ছাড়িয়ে সে নাম বহু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পায় সম্বোধনে। এ সব নাম আসে দল, সমর্থক, গুণগ্রাহী, মিডিয়া বা অন্যান্য উৎস থেকে। নিজেরাও এসব ‘টাইটেল’ ম্যানেজ করে নেন নানাভাবে।
    ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথকে গান্ধী ‘গুরুদেব’ সম্বোধন করার পর রবীন্দ্রনাথ আত্মজীবনীতে তাঁকে ‘মহাত্মা’ বলে উল্লেখ করেন বলে জানা যায়। সেই থেকে ‘মহাত্মা গান্ধী’ বলা ও লেখা শুরু বলে দাবি করেন অনেকে। আর রবীন্দ্রনাথ ‘গুরুদেব’ ছাড়াও সম্বোধিত হন ‘কবিগুরু’, ‘বিশ্বকবি’, ‘ঋষি’ হিসেবে। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্মানিত হতেন ‘মহর্ষি’ নামে। ওই সময়ে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ‘রাষ্ট্রগুরু’, চিত্তরঞ্জন দাশ ‘দেশবন্ধু’, জগদীশচন্দ্র বসু ‘বিজ্ঞানাচার্য’, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ‘বেঙ্গল টাইগার’ বা ‘বাংলার বাঘ’। বাঘ, শার্দুল প্রভৃতি ছিলেন আরও। তবে শেরে বাংলা বলতে এখন একজনই - এ কে ফজলুল হক। ১৯৩৮ সালে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহকে ‘কায়েদে আজম’ উপাধিতে ভূষিত করেন দিল্লি’র ‘আমান’ পত্রিকার সম্পাদক মওলানা মজহারউদ্দিন শহিদ। এ দাবি লাহোরের মিয়া ফিরোজউদ্দিন আহমদের পরিবারও করে থাকে। ওদিকে জওয়াহরলাল নেহরু’র পরিচিতি ‘পণ্ডিত’ উপাধিতে। আমাদের মওলানা ভাসানী ‘মজলুম জননেতা’। ১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেবরুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ওই অনুষ্ঠানমঞ্চে উপস্থিত ছিলাম আমিও। পরে তাঁকে ভূষিত করা হয়েছে ‘জাতির জনক’ ‘জাতির পিতা’ উপাধিতে। এখন আমাদের আছেন বঙ্গতাজ, দেশরত্ন, জননেত্রী, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, দেশনেত্রী, আপসহীন নেত্রী, পল্লীবন্ধু, বঙ্গবীর ও আরও অনেকে।
সাহিত্যে আছেন মহাকবি, বিদ্রোহী কবি, পল্লীকবি, ঐতিহ্যের কবি, প্রধান কবি এবং সব্যসাচী, বহুমাত্রিক, বিতর্কিত, প্রথাবিরোধী, নন্দিত লেখক। উপাধি নিয়ে আছেন আরও অনেকে। চলচ্চিত্রে আছেন নায়করাজ, ড্যাশিং হিরো, বিউটি কুইন...। সংগীতে আছেন গজল কিং, মেলোডি কুইন, পপ সম্রাট, স্বর্ণকণ্ঠী...।
তবে নামে নাকি কিছু যায় আসে না - শেঙপিয়ার বলেছেন। আর এ কথায় কান দেন না এমন মানুষও আছেন অনেক। সংখ্যায় হয়তো তাঁরাই বেশি। এখানে একজনের কথাই বলি। তিনি জায়ারে (কঙ্গো)-র সাবেক একনায়ক মবুতু সেসে সেকো (১৯৩০-১৯৯৭)। তাঁর আসল নাম জোসেফ ডিজাইরে মবুতু। ক্ষমতাসীন হয়ে ধারণ করেন “মবুতু সেসে সেকো কুকু ঙ্গবেনদো ওয়া যা বাঙ্গা” নামটি আর উপাধি গ্রহণ করেন “মবুতু আওয়া, মবুতু কুনা, মবুতু পরতাওত”। মবুতু সেসে সেকো কুকু ঙ্গবেনদো ওয়া যা বাঙ্গা’র আক্ষরিক অনুবাদ - ‘সর্বশক্তিমান যোদ্ধা যিনি জয়ী হবেন ধৈর্য ও ইচ্ছার বলে, করে চলবেন অভিযানের পর অভিযান, যাত্রাপথে রেখে যাবেন জ্বলন্ত অগ্নিরেখা’। আর মবুতু আওয়া, মবুতু কুনা, মবুতু পরতাওত-এর অর্থ ‘মবুতু এখানে, মবুতু সেখানে, মবুতু সবখানে’।
মৃত্যুর কিছু আগে বিদ্রোহে উৎখাত হন এই ‘সর্বশক্তিমান যোদ্ধা’। ট্রান্সপারেন্সি ইনটারন্যাশনালের মতে, সাম্প্রতিক কালে তিনিই ছিলেন আফ্রিকার সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ শাসক। এ ক্ষেত্রে বিশ্বে তাঁর অবস্থান তৃতীয়।
২২.১১.২০১২
sazzadqadir@gmail.com

শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১২

কানেকশনে কালেকশন

কানেকশন ছাড়া কিছুই হয় না এ দেশে। কানেকশন অর্থ যথাস্থানের যথাব্যক্তির সঙ্গে দহরম। প্রভাব, প্রতিপত্তি, প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ওঠবস। ক্ষমতাবলয়ের দল গ্রুপ গোষ্ঠী লবি’র সঙ্গে লেনদেন। এ কানেকশন আপনাকে দেয় প্রমোশন, নমিনেশন, রিকগনিশন, রিসেপশন, একিউমিলেশন। অর্থাৎ কানেকশন থেকে কালেকশন। সব ধরনের কালেকশন। তাতে ধনে মানে তর-তর করে আপনি উঠে যাবেন উপরে। তারপর একদিন হয়তো হয়ে উঠবেন আকাশছোঁয়া। আর আপনার যদি কানেকশন না থাকে তবে আপনি অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে থাকবেন - তা প্রতিভা, মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা আপনার যতই থাকুক। আপনাকে ঠেলে সরিয়ে রাখা হবে এক পাশে। আপনি থাকবেন অবহেলিত, উপেক্ষিত, একঘরে। কোথাও উচ্চারিত হবে না আপনার নাম, কোথাও কোনও তালিকায় নাম থাকলেও তা কেটে দেয়া হবে ঘ্যাঁচ করে। কারণ আপনাকে প্রান্তিক করে না রাখলে বিকাশ ঘটে না অন্যদের মহিমার। সদ্যপ্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ক্ষমতা-ব্যবস্থার এ ভয়ঙ্কর রূপটি তুলে ধরেছেন তাঁর একটি বিশিষ্ট রচনা - ‘কর্ণ’ নামের এক মননশীল সন্দর্ভে। ‘মহাভারতে’র কর্ণ এক অতিমানবিক প্রতিভা। তাঁকে বলা হয়েছে সে যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ কৃষ্ণের সমকক্ষ। সন্দর্ভটিতে সুনীল দেখিয়েছেন, “কর্ণকে আগাগোড়া প্রান্তিক করে রাখার পিছনে রয়েছে ক্ষমতা-ব্যবস্থার নিষ্ঠুর চক্রান্ত, যা আসলে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্থিতাবস্থা বজায় রাখারই প্রয়াস। অর্জুন রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্বাচিত, কর্ণ তার একমাত্র প্রতিপক্ষ, অতএব তাঁকে প্রান্তিক করে রাখাই শ্রেয়। এই কারণেই ভীষ্ম, দ্রোণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনেতারা সকলেই তাঁকে বারবার হেয় প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন, তাঁর মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছেন।...” (রাহুল দাশগুপ্ত, ভূমিকা: ‘জীবনের বর্ণচ্ছটা’, ২০১১)
    এ তো গেল প্রতিষ্ঠার কুচক্রীদের কথা। সিংহাসনের কানেকশনের ষড়যন্ত্র। আর এ কানেকশন যখন একিউমিলেশন অর্থাৎ সম্পদ পুঞ্জীভূত করার দিকে ধাবিত হয় তখন কি ঘটে তা আমরা দেখছি হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে। ডেসটিনি, শেয়ারবাজার ও অন্যান্য কেলেঙ্কারিও কানেকশন ছাড়া হয় নি নিশ্চয়। আর যমুনা সেতু? উদাহরণ দেয়া যায় আরও। দেয়া যায় সকল জমানা থেকেই। তবে কানেকশনের এক বীভৎস ও মর্মান্তিক রূপ দেখা গেল শিশু পরাগ মণ্ডল অপহরণ ঘটনায়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই অপহরণের সঙ্গে জড়িত দলবলের কানেকশন বেশ জোরালো। সেই জোরেই এত সিনাজুরি তাদের। তবে তাদের জারিজুরি ফাঁস হতে দেরি হয় নি বেশি। র‌্যাব, গোয়েন্দা ও পুলিশের জোর তৎপরতায় পরাগকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তাই। বলা চলে, দুর্বৃত্তরা বাধ্য হয়েছে জিম্মি করা পরাগকে ছেড়ে দিতে। তবে শর্ত মানা হয়েছে তাদের। এই মান্যতা আমাদের ব্যথিত, বিস্মিত করে আর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি। তারা শুধু একটি শিশুকে যেন নয়, জিম্মি করে ফেলে গোটা ব্যবস্থাকেই। তাই ওই দলবলের নেতানেত্রীদের উদ্দেশ্যে বলি, বড়-বড় কথা আর শোভা পায় না আপনাদের মুখে। গলাবাজি বন্ধ করুন।
    পরাগ উদ্ধারে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তাঁদের এ সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে ‘হোস্টেজ নেগোশিয়েশন’ (জিম্মি নিয়ে কষাকষি) পদ্ধতি। দেশে অপহরণের ঘটনা আকছারই ঘটছে, কিন্তু সর্বত্র এ কৌশল ও পদ্ধতি ব্যবহারে নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কানেকশনের জোরে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। অনেক ঘটনায় আহত-নিহত হচ্ছে জিম্মি হওয়া নর-নারী-শিশু। এ অবস্থায় অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও পদ্ধতি যাতে সকলের জন্য হয়ে উঠতে পারে তা দেখতে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি সরকারের প্রতি। সেই সঙ্গে জানতে চাইছি বিএনপি-নেতা ইলিয়াস আলী ও তাঁর গাড়িচালক অপহৃত হওয়ার পর কি-কি কৌশল ও পদ্ধতি ব্যবহার করে তাঁদের উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সাগর-রুনি’র হত্যা তদন্তেই বা ব্যবহৃত হয়েছে কি-কি প্রযুক্তি।
    আমরা বিশ্বাস করি, অপরাধীর যত দুর্ধর্ষই হোক - আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে উন্নত প্রযুক্তি, সামগ্রী, সরঞ্জাম থাকলে তাদের দমন করা সম্ভব। তবে কানেকশন বলে কথা। তখন কালেকশন হয়ে যায় ঠিক-ঠিক। তারপর কমিশন বসিয়ে অমিশন।
sazzadqadir@rediffmail.com

শনিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১২

ওবামা আবার

বারাক ওবামা’র পুনঃনির্বাচন সম্পর্কে আমার আশপাশের কারও সন্দেহ ছিল না একটুও। মারকিন প্রেসিডেন্টরা দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য প্রার্থী হয়ে হারেন নি কখনও - এমনই বিশ্বাস অনেকের। ওয়াশিংটন, জেফারসন, মেডিসন, মনরো, জ্যাকসন, লিঙ্কন, গ্র্যান্ট, ক্লিভল্যান্ড, ম্যাককিনলি, উইলসন, ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, আইজেনহাওয়ার, নিকসন, রিগান, ক্লিনটন ও জর্জ ডবলিউ বুশ নির্বাচিত হয়েছেন দু’বার। থিওডোর রুজভেল্ট, কুলিজ ট্রুম্যান ও লিনডন জনসন প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন প্রেসিডেন্টের মৃত্যুতে, পরে নির্বাচিত হয়েছেন আরেক মেয়াদের জন্য। তাঁদেরও তাই বলা যায় পুনঃনির্বাচিত। তবে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিতও হয়েছেন অনেক প্রেসিডেন্ট। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জন এডামস, জন কিউ এডামস, ভ্যান বুরেন, বি. হ্যারিসন, টাফট, থিওডোর রুজভেল্ট, হুভার, কারটার ও জর্জ এইচ ডবলিউ বুশ। কাজেই ওবামা’র ব্যাপারে সন্দিহানও ছিলেন অনেকে। সে সব সন্দেহের কথাও শুনছিলাম কিছু-কিছু।
পেনসিলভ্যানিয়া’র ওয়েস্ট চেসটার-এর বাসিন্দা আমার এক আত্মীয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কে জিতবে নির্বাচনে? ওবামা না রমনি? সে উত্তর দেয় সঙ্গে-সঙ্গে, রমনি। পরে দেখলাম পেনসিলভ্যানিয়া’য় জিতেছেন ওবামা-ই। আমার ওই আত্মীয়া এবং এমন আরও অনেকে রমনি’র কথা বলেছেন নানা কারণে। আবার অনেকে সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেছেন, দু’জনের মধ্যে তফাৎ কি? একই তো। কেউ-কেউ বলেছেন, তফাৎ আছে। বিশেষ করে আমাদের জন্য। হিলারি ক্লিনটনের সূত্রে ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। এই সুসম্পর্ককে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ফ্যাক্টর মনে করেন কেউ-কেউ।
আসলে যার-যার অবস্থান থেকে এমন হিসাব-নিকাশ চলে নির্বাচনে। বাংলাদেশে ইউনূস ফ্যাক্টর, আর ইসরাইলে ফ্যাক্টর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। নির্বাচনী প্রচারাভিযানকালে সকল সৌজন্য শালীনতা ও জাতীয় কৃতজ্ঞতা ভুলে তিনি রমনি’র বন্ধু হিসেবে ওবামা’র বিরুদ্ধে যে বিষোদ্গার করেছেন তার জন্য এখন ইসরাইলের শীর্ষ দৈনিক হারেৎজ-কে শিরোনাম করতে হয়েছে - “আমরা দুঃখিত, প্রেসিডেন্ট ওবামা, ক্ষমা করুন প্রধানমন্ত্রীকে!”
এবার অনেক ইস্যু-বিতর্ক দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ওবামা’র নির্বাচন ঘিরে। তাহলেও তিনি এত ভোটে জয়ী হলেন কিভাবে?
প্রথমত, অভিবাসীরা খুশি ছিলেন না তাঁর ওপর - তিনি তেমন কিছু করেন নি বলে। কিন্তু যেটুকু যা করেছেন তা-ও নস্যাৎ করে দিতে পারেন রমনি - এ আশঙ্কা ছিল তাঁদের। দ্বিতীয়ত, ‘মেডিকেয়ার’ নামে পরিচিত ওবামা’র  স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থার সংস্কারকে ‘ওবামাকেয়ার’ বলে ঠাট্টা করেছেন রমনি। কিন্তু এ মশকরা ভাল চেখে দেখেন নি সুবিধাভোগী নিম্নবিত্ত ও প্রবীণ নাগরিকেরা। তৃতীয়ত, গর্ভপাত করা যাবে না - ধর্ষণের শিকার হলেও - রমনি শিবিরের এমন কট্টর অবস্থানে অসন্তুষ্ট হয়েছেন নারী ভোটাররা। যে নারীরা গর্ভপাতবিরোধী ছিলেন তাঁরাও আতঙ্কিত হয়েছেন এত দিনের একটা স্বাধিকার হারানো বা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার আশঙ্কায়। চতুর্থত, তেমন সফল না হলেও বিদেশে নতুন-নতুন বন্ধু সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন ওবামা - এটা প্রশংসা পেয়েছে অনেকের। তাঁর ইরাক ও আফগান যুদ্ধে ইতি ঘটানোর উদ্যোগও পেয়েছে বিশেষ সমর্থন। বহু ভোটার মনে করেন, বিশ্বপরিস্থিতি নিরাপদ না হলেও আগের চেয়ে যে উন্নত হয়েছে  তা-ই বা মন্দ কি! এছাড়া গুয়ানতানামো বন্দিশিবির বন্ধ করতে না পারা, লিবিয়া সঙ্কট, বেনগাজিতে রাষ্ট্রদূত হত্যা  ইত্যাদি বিষয়গুলো সেভাবে উঠে আসে নি সামনে। ভোটারদের বেশির ভাগ ভেবেছেন, নতুন কোনও মর্যাদা বা মহিমায় দেশকে উন্নীত না করতে না পারলেও দেশকে কোথাও অবনতও করান নি ওবামা। পঞ্চমত, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, বলতে গেলে, মিডিয়া’র প্রাণঢালা সমর্থন পেয়েছেন ওবামা। তাঁর অনেক ভুলচুক দেখেও দেখে নি তারা। ষষ্ঠত, রমনি’র সমস্যা - তিনি মরমন সম্প্রদায়ের মানুষ। এ সম্প্রদায়কে খৃস্টান মনে করে না খৃস্টানরা। অন্যদিকে ওবামাকে তারা মনে করে ঘাপটি মারা মুসলমান। তাহলেও কথায় ও কাজে ওবামা সবসময়েই তুলে ধরেছেন খৃস্টিয় সংস্কার ও মূল্যবোধ। ভোটাররা ভেবেছেন, এ-ও মন্দের ভাল।
আরও অনেক ফ্যাক্টর নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যায়, কিন্তু ওবামা’র বিজয় কাছে বা দূরে থেকে এত স্পষ্ট দেখা গেছে যে, এ নিয়ে কার্যকারণ খুঁজে বেড়ানোটাই অকারণ মনে হয়।

facebook.com/sazpa85

শনিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১২

দেশবাসীর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ

শ্রীশচন্দ্র দাশের ‘সাহিত্য-সন্দর্শন’ নামে একটি বই আমাদের পাঠ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই বই পড়ে সাহিত্যের নানা বিষয় ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নানা ধারণা পেয়েছি আমরা। তবে সাহিত্য সংক্রান্ত সে সব বিচার জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে কাজে লাগে নি তেমন। যেমন, সমালোচনা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “সহৃদয়তা, রসবোধ ও উদারতা সমালোচকের প্রধান গুণ।” রাজনীতিতে এই তিন গুণের স্থান নিয়েছে বিরোধিতা, নিন্দাবাদ ও গালাগালি। আর সে গালাগলি হয় রীতিমতো বাপ-মা তুলে।
    কবিতা, সাহিত্য বা রাজনীতিতে অনেক ম্যাজিক থাকে, কিন্তু ‘সমালোচনা লজিক হতে বাধ্য’। তা হলেও ‘সমালোচনা কারও পছন্দ নয়, সত্য হলেও নয়।’ রবীন্দ্রনাথও সমালোচনা করেছেন সমালোচকদের, “মূলধন না থাকিলেও দালালির কাজে নামিতে কাহারও বাধে না, তেমনি সাহিত্য সমালোচনায় কোনও প্রকার পুঁজির জন্য কেহ সবুর করে না। কেননা, সমালোচকের পদটা সম্পূর্ণ নিরাপদ।” তবে আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে মূল্যায়ন-বিশ্লেষণের কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রশংসা আর নিন্দা ছাড়া কিছুই হয় না শেষ পর্যন্ত। আমরা দেখে-দেখে শুনে-শুনে বাধ্য হয়েছি এ ভবিতব্যই মেনে নিতে। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, “বোধ হয় বড় হলেই লোকে নিন্দে করে।” রবীন্দ্রনাথ কিছুটা কৌতুক করেই বলেছেন, “নিন্দা না থাকিলে পৃথিবীতে জীবনের গৌরব কি থাকিত! একটা ভাল কাজে হাত দিলাম, তাহার নিন্দা কেহ করে না - সে ভাল কাজের দাম কি!” নিন্দাচর্চার একটি ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন:
    “ওকে তুমি বলো নিন্দুক, - তা সত্য।
    সত্যকে বাড়িয়ে তুলে বাঁকিয়ে দিয়ে ও নিন্দে বানায় -
    যার নিন্দে করে তার মন্দ হবে বলে নয়,
    যারা নিন্দে শোনে তাদের ভাল লাগবে বলে।...” (‘অপরাধী’, “পুনশ্চ”)
তবে যা-ই বলুন... তিনিও সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন নি সমালোচনাকে। তাই নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর বোলপুরে আয়োজিত সংবর্ধনায় নিজের ক্ষোভ আর দমিয়ে রাখতে পারেন নি, সবই উগরে দিয়েছিলেন সমবেত সুধীজনের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনা সম্পর্কে কবি-সমালোচক মেহিতলাল মজুমদার বলেছেন, “... (রবিবাবু) আমাদের শুধু জুতো মরতে বাকি রেখেছে। বললে কিনা... ‘গ্রাম্য বালকেরা যেমন কুকুরের লেজে টিন বেঁধে হাততালি দিয়ে তাড়া করে বেড়ায়, আপনারা তাই করতে এসেছেন।’ সভা ভাঙার পর আমরা সবাই হেঁটে বোলপুর স্টেশনে ফিরছি, তখন রবিবাবু জগদীশ বোসকে নিয়ে আমাদের গায়ে ধুলো ছিটিয়ে টমটম হাঁকিয়ে চলে গেলেন।”
সমবেত সুধীজনের সংবর্ধনা গ্রহণ না করে রবীন্দ্রনাথ সেদিন বলেছিলেন, “আজ আমাকে সমস্ত দেশের নামে আপনারা যে সম্মান দিতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন তা অসঙ্কোচে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করি এমন সাধ্য আমার নেই।... দেশের লোকের হাত থেকে যে অপযশ ও অপমান আমার ভাগ্যে পৌঁছেছে তার পরিমাণ নিতান্ত অল্প হয় নি, এবং এতকাল আমি তা নিঃশব্দে বহন করে এসেছি।... যে কারণেই হোক, আজ ইউরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন। তার যদি কোনও মূল্য থাকে তবে সে কেবল সেখানকার গুণীজনের রসবোধের মধ্যেই আছে, আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনও আন্তরিক সম্বন্ধ নেই।... অতএব আজ যখন সমস্ত দেশের জনসাধারণের প্রতিনিধিরূপে আপনারা আমাকে সম্মান উপহার দিতে প্রবৃত্ত হয়েছেন, তখন সে সম্মান কেমন করে নির্ল্লজ্জভাবে গ্রহণ করবো? আমার আজকের এই দিন তো চিরকাল থাকবে না। আবার ভাটার বেলা আসবে, তখন পঞ্চতলের সমস্ত দৈন্য আবার তো ধাপে ধাপে প্রকাশ হতে থাকবে।... তাই আমি আপনাদের কাছে করজোড়ে জানাচ্ছি - যা সত্য তা কঠিন হলেও আমি মাথায় পেতে নেবো, কিন্তু সাময়িক উত্তেজনার মায়া যা, তা স্বীকার করে নিতে আমি অক্ষম। কোনও কোনও দেশে বন্ধু ও অতিথিদের সুরা দিয়ে অভ্যর্থনা করা হয়। আজ আপনারা আদর করে সম্মানের যে সুরাপাত্র আমার সম্মুখে ধরেছেন, তা আমি ওষ্ঠের কাছে পর্যন্ত ঠেকাবো, কিন্তু এ মদিরা আমি অন্তরে গ্রহণ করতে পারবো না। এর মত্ততা থেকে আমি চিত্তকে দূরে রাখতে চাই।...”
কিন্তু নিন্দা-সমালোচনা শুধু সাহিত্যের চাপান-উতোর নয়... জীবনের সত্য, রাজনীতির বাস্তবতা। সমালোচনা এড়িয়ে চলতে চাইলে কিছু করা যাবে না, বলা যাবে না, কিছু হওয়াও যাবে না। তা তো সম্ভব নয়। সমালোচনা থাকবে, কাজও থেমে থাকবে না। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চারচিল (১৮৭৪-১৯৬৫) বলেছেন, Criticism may not be agreeable, but it is necessary. It fulfils the same function as pain in the human body. It calls attention to an unhealthy state of things.  মারকিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট (১৮৫৮-১৯১৯) সমালোচনার প্রতি আরও জোর দিয়ে বলেছেন, To announce that there must be no criticism of the president... is morally treasonable to the American public.
এরপর মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন মনে করি।


sazzadqadir@rediffmail.com

উৎসবের উৎসর্গে

জীবনে সংযম, সমাজে কৃচ্ছ্র - কিছুই চোখে পড়ে না তেমন, তারপরও সংযম-অবসানের উৎসব ঈদ উল-ফিতর পালন করেছি আমরা। এবার উৎসর্গের উৎসব ঈদ আল-আজহা। ঈদ-উজ-জুহা। এ উৎসবে কি দেবো উৎসর্গ? প্রায় সব উৎসবই তো উৎসর্গ করে ফেলেছি আমরা, আর কি আছে উৎসর্গের?
    প্রকৃতির বুকে যে শোভা ও সম্পদ ছিল তা আজ কোথায়? বনাঞ্চল উজাড়। পাহাড় কেটে সাফ। নদী নালা খাল বিল হাওর ক্রমশ শুকনো ডাঙ্গা। পশু পাখি মাছ ফল ফুল উধাও। শ্যামলী নিসর্গের বুকে মরুবিস্তারই এখন শুধু এক অব্যাহত বাস্তবতা।
    সামনে ডিসেম্বর।  বিজয়ের মাস। বিজয়ের উৎসব করেছি আমরা। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়। সে সব বিজয়ও তো উৎসর্গ হয়ে গেছে। বিশ্বায়নের বুকে জাতীয়তাবোধ আজ বিলীয়মান। লুটেরা ধনিক শ্রেণীর ক্রমোত্থানে সমাজতন্ত্র নিষিদ্ধ। সামপ্রদায়িকতা-মৌলবাদের গ্রাসে পড়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। গণতন্ত্র শিকার হয়েছে কলহপরায়ণ রাজনীতির। বিশ্বমোড়লেরা খামচে ধরেছে স্বাধীনতাকে। থাবা এসে পড়েছে সাগরগর্ভের - ভূগর্ভের সম্পদে।
    ওদিকে শিল্পাঞ্চলে বিকাশ ঘটেছে কারখানা ভাঙচুর শিল্পের। শিক্ষাঙ্গন হয়েছে রণাঙ্গন। প্রশাসনে চলে নির্লজ্জ দলীয়করণ। আইন-শৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ করে চলে সন্ত্রাস। চলে চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ - সব রকম বাজের দাপট। নারীর ক্ষমতায়ন পরিণত হয়েছে উত্ত্যক্তিতে। আর উত্ত্যক্তকারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে আসে নিন্দামন্দ, হুমকি, আরও বিপদ। আমি নিজে পর্যন্ত এর শিকার। পাশাপাশি শতক-প্রাচীন পরদা-অবরোধ প্রথাবিরোধী আন্দোলনের পর এসেছে বোরকা-প্রথার হুমকি। ওদিকে কালো টাকা, খেলাপি সংস্কৃতি, দুর্নীতি বসেছে জাঁকিয়ে। বেপরোয়া হয়ে উঠেছে লুট, জালিয়াতি, সন্ত্রাস।
    তাহলে আজ কি উৎসর্গ আমাদের?
    আগে বলতাম পশুহত্যার কথা। বলতাম এ হত্যা প্রতীকী। আমাদের ভেতর আছে পশুপ্রবৃত্তি। কখনও সে প্রবৃত্তিতাড়িত হই আমরা। সে তাড়নার ধ্বংস এবং এমন আরও যা কিছু আছে অশুভ  সে সবের বিনাশ ঘটাতে সঙ্কল্প করি আমরা এই উৎসর্গের উৎসবে। কিন্তু এখন কি আর এ সব বলে কেউ নিজেদের পরিচয় দেবেন পশুবিদ্বেষী বলে? পাশব, পাশবিক, পাশবিকতা, নরপশু, পশুসুলভ, পশুপ্রবৃত্তি - এ সব শব্দ এখন লিখেন বা বলেন - এমন লোকের সংখ্যা এখন খুবই কম। কারণ পশু সবসময় প্রাকৃতিক আচরণ করে, হত্যা ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে না। মানুষই বরং করে অপ্রাকৃতিক আচরণ। যাবতীয় কুকর্ম, দুষ্কর্ম। পশু নয় মানুষই দুরাচারী। কাজেই পশুহত্যার পুরনো ব্যাখ্যা দেয়া বৃথা। দেশে অপ্রতুল পশুসম্পদ। সে দিক থেকেও তেমন যুক্তি দেয়া যাবে না হত্যার পক্ষে। অমুসলিম দেশে কোরবানির জন্য পশুহত্যার অনুমোদন মেলে না সহজে। কোনও-কোনও দেশে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত। ইদানীং মুসলিম-প্রধান দেশেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে পশুরক্ষা সমিতি, পশুক্লেশ নিবারণী সংস্থাগুলো।  ফরাসি দেশের সাবেক যৌন তারকা ব্রিজিত বারদো তো কয়েক দশক ধরে রীতিমতো যুদ্ধ করে চলেছেন কোরবানি প্রথার বিরুদ্ধে। এখন তাঁর সে যুদ্ধ দাঁড়িয়েছে সরাসরি ইসলামের বিরুদ্ধে।
    প্রখ্যাত কথাশিল্পী মাহবুব-উল-আলম (১৮৯৮-১৯৮১) তাঁর “তাজিয়া” (১৯৪৬) গল্পগ্রন্থের “কোরবাণী” গল্পে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলোর একটি সৃষ্টি করেছেন - রমিজ-পরিবারের পোষা গরু ‘মুন্না’কে উৎসর্গ করার বর্ণনায় - “... রমিজ যখন বাড়ীর দরজায় আসিয়া পৌঁছিল, হাফিজ ও আর দুই-তিনটি জোয়ান মুন্নাকে তখন মাটিতে কাৎ করিয়া ফেলিয়াছে। হাফিজ তখন ঘাড়টা বাঁকাইয়া মুখটা এ-ভাবে মাটিতে চাপিয়া ধরিয়াছে যে, তাহার গলাটা উপরে উঠিয়াছে, আর ঠিক ইহারই ঊর্ধ্বে কৃপাণ উদ্যত করিয়া ইমাম বিড় বিড় মন্ত্র পড়িতেছেন।... মুন্না এতগুলি জোয়ানের চাপে ঠির ঠির করিয়া কাঁপিতেছিল। ভয়ে তাহার গলা শুকাইয়া কাঠ হইয়া গিয়াছিল। চোখে সে কিছুই দেখিতে পাইতেছিল না;... প্রাণপণে একবার পা ছুড়িতে চেষ্টা করিল; মুখের অব্যক্ত আওয়াজ সম্মুখে পথ না পাইয়া পেটের ভিতর বাজিয়া উঠিল ‘অঁ -’। আর এমনি সময় ইমাম সাহেব... উহার গলায় কৃপাণ চালাইয়া দিলেন। রমিজ ও বৌয়ের নাম শোনা গেল; আর নামগুলি ফিন্‌কি দিয়া ঘড় ঘড় শব্দে যে রক্ত ছুটিল উহাতে তলাইয়া গেল।... মুন্নার চোখ দু’টি প্রাণহীন মুক্তার ন্যায় অপলকে চাহিয়া আছে, ছিন্ন কণ্ঠনালী ও উহার দু’পাশের মাটিতে রক্ত জমাট বাঁধিয়া সবুজের বুকে যেন মরিচা ধরাইয়া দিয়াছে।... যে রক্তপাত হইয়া গেল উহা যেন মুন্নার নহে, কোথা দিয়া কি করিয়া যেন বাড়িরই হৃৎপিণ্ড হইতে অজস্র রক্ত বাহির হইয়া গিয়াছে।...”
    কিন্তু যতই হৃদয়বিদারক হোক পশুহত্যায় ঘাটতি নেই কোথাও। প্রতি বছর এর জোশ বাড়ছে। ব্যয় বাড়ছে, শান বাড়ছে। কারণ এর সঙ্গে অনেক স্বার্থ এবং বিপুল অর্থ জড়িত। সে স্বার্থ অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক, ধান্দাগত। উট-দুমবা-গরু আমদানি ও চোরাচালান জড়িত এ ব্যবসায়ে। হাট ইজারা, পরিবহন ব্যবসা, পোশাকিদের চাঁদাবাজি, দলীয়দের তোলা আদায়, বাঁশ ফেলে টোল, গাড়ি বা ফেরি আটকে সেলামি, মাইকিং করে ভিক্ষা - এ রকম বহু কিছু জড়িত। মসজিদ-মাদরাসা থেকে চামড়া ও হাড়গোড় শিল্প পর্যন্ত জড়িত। পাড়ার মাসতান, ক্লাব, কল্যাণ সমিতি থেকে মহান নেতানেত্রীদের নামধারী পরিষদ পর্যন্ত জড়িত। মন্ত্রী-এমপি জড়িত। নামীদামিদের সামাজিক মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি জড়িত। সামনের সকল ইলেকশন জড়িত। ওই সব ইলেকশনে যারা জড়িত তারাও জড়িত।
    তাহলে কবি নজরুল যে লিখেছিলেন “ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ - সত্যের উদ্বোধন” - সেই সত্য আজ কি? আজ আমাদের কি উৎসর্গ করতে হবে? কি উৎসর্গ করলে সার্থক হবে উৎসব?
    আমি তো মনে করি প্রথমে আমাদের উৎসর্গ করতে হবে যুগে-যুগে জমে ওঠা যাবতীয় জঞ্জাল। সহজ নয় কাজটি। ঘাড়ে চেপে বসে সে জঞ্জাল এখন বিষম ভার হয়ে উঠেছে দেশ জাতি জনগণের জন্য। তবুও যত কঠিনই হোক, ত্যাগ আমাদের করতেই হবে। ভূয়া নেতাদের ভোট দেয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। তাদের সঙ্গে দহরম মহরম বন্ধুত্ব ত্যাগ করতে হবে। দুর্নীতিপরায়ণ আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবের প্রতি মায়ামমতা ত্যাগ করতে হবে। কুসন্তানকে প্রশ্রয় দেয়া ত্যাগ করতে হবে। পরিবারের বা পাড়ার দুর্বৃত্তদের সহ্য করা ত্যাগ করতে হবে। চেনাজানা ভূয়া ও দুর্জনের মুখোশ উন্মোচনে চক্ষুলজ্জা ত্যাগ করতে হবে। কিছু অভ্যাস, কিছু সহিষ্ণুতা, কিছু ভুল সৌজন্য, মনের কিছু দুর্বলতা, নিজের কিছু প্রাপ্তির আশা - এই সবকে সামান্য ভেবে ত্যাগ করতে পারলে একদিন কিন্তু সত্যি-সত্যিই ঘটতে পারে সত্যের অসামান্য উদ্বোধন। খুব তাড়াতাড়ি কোনও কিছুই হবে না, কিন্তু ত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুললে ... আচ্ছা, ভাবতে দোষ কি... একদিন হয়তো ঘুষ-চাঁদা দিতে হবে না, মাসতানের রক্তচক্ষু থাকবে না, নেতার সঙ্গে কর্মী থাকবে কিন্তু ক্যাডার থাকবে না, নকলবাজ ছাত্র ও নকল সরবরাহকারী শিক্ষক থাকবে না, তদবিরবাজ ও ধান্দাবাজ থাকবে না, দলবাজ কবি লেখক সাংবাদিক বিচারক থাকবে না, নারীগঞ্জক থাকবে না, অন্ন বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত মানুষ - ভিখিরি - ফুটপাতে অসহায় জীবন, ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না থাকবে না।
    আজ ওই ত্যাগ ও উৎসর্গই বাকি আছে আমাদের উৎসবের জন্য। আসুন সবাই মিলিত হই এ উৎসবে। বলি “সকলের তরে মোরা সবাই, সুখ-দুখ সম-ভাগ ক’রে নেব সকলে ভাই...।”

sazzadqadir@rediffmail.com

বৃহস্পতিবার, ১১ অক্টোবর, ২০১২

পাকা চোর অতিশয়

অনেক কিছু চুরি গেছে আমার। মূল্যবান বইপত্র, বহু কষ্টে সংগৃহীত সিডি-ডিভিডি, প্রিয় সেলফোন সেট, স্মৃতিবাহী আংটি-ঘড়ি, বিদেশ থেকে আনা শিল্প-কর্ম, তৈজসপত্র, সজ্জা ও শয্যা সামগ্রী, আমার অতি সাধের হারকিউলিস সাইকেল... আরও কত শখের ও স্মৃতির জিনিস। নগদ টাকা, স্থাবর সম্পত্তি। আর আমাদের টাঙ্গাইল শহরের আকুরটাকুর পাড়ার বাড়ি থেকে চুরি গেছে এবং এখনও যাচ্ছে কত কি। পুকুরের মাছ, গাছের ফল-ফুল, খোঁয়াড় থেকে হাঁস মোরগ মুরগি ডিম, গোয়াল থেকে ছাগল-খাশি গরু-ছাগল, বাগানের শাকসবজি, বাঁশ গাছ কলা গাছ লতি-লতা... আরও অনেক কিছু। এখন তো চুরি হয়ে গেছে বাড়িটারই অনেকখনি।
এই চোরদের সঙ্গে কখনও দেখা-সাক্ষাৎ হয় না আমার। যারা সিনাজুরি করে, নানা ফন্দি-ফিকির করে, হাতিয়ে নিয়েছে - তাদের নিয়ে কোনও সমস্যা নেই আমার। কারণ পারতপক্ষে আমার সামনেই আসে না তারা। আর যারা গোপনে হাতসাফাই করে সটকে পড়েছে তাদের তো চিনিই না আমি। দু’একজনকে হয়তো সন্দেহ করি, কিন্তু তাতে তো চোর ধরতে পারি না নিশ্চিত হয়ে। রবীন্দ্রনাথের বা অন্নদাশঙ্করের ‘গিন্নি’র মতো জোর দিয়ে কাউকে চোর বলায় বিপদও আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘গিন্নি’র দু’চোখের বিষ ‘পুরাতন ভৃত্য’ কেষ্টা। তাই “যা কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, কেষ্টা বেটাই চোর!” আর অন্নদাশঙ্করের ‘গিন্নি’র মতে সব নষ্টের গোড়া কম্যুনিস্ট পার্টির লোকজন। তাই যেখানে যা-ই ঘটুক তিনি দোষ দেন তাদের - “মুরশিদাবাদে হয় না বৃষ্টি? মূলে কেটা? গিন্নি বলেন, কম্যুনিস্টি!”
আমাদের এখানেও ‘গিন্নি’ আছেন অমন। ‘চোর’ বা ‘কম্যুনিস্টি’ খুঁজতে বেশি ভাবতে হয় না তাদের। আগে থেকেই সব জেনে বসে থাকেন বলে সঙ্গে-সঙ্গে বলে দেন ফস করে ‘মূলে কেটা’। রোহিঙ্গ্যা কেন এদেশে আসে, বোড়োল্যান্ডে কেন দাঙ্গা লাগে, বিশ্বব্যাংক কেন ঋণ নিয়ে ঘাপলা করে, সোনালী ব্যাংকে কেন ঋণ জালিয়াতি হয়, রামু-পটিয়ায় কেন হাঙ্গামা হয় - সব তাদের জানা। তাই চক্রান্তকারী দুর্বৃত্তদের নাম বলতে দেরি হয় না একটুও।
আমার সমস্যা চোর মহাচোর বিশ্বচোরদের নিয়ে। পত্রিকায় তাদের বৃত্তান্ত পড়ি, টেলিভিশনে কর্মকাণ্ড দেখি, লোকমুখে শুনি, জানি - তারপর এদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় এখানে সেখানে। তখন সালাম আদাব দিতে হয় তাদের, হাসিমুখে কথা কইতে হয়, আদর-আপ্যায়ন করতে হয়, সভা সমাবেশ সেমিনারে সৌজন্য দেখিয়ে নানরকম প্রশংসাও করতে হয়। জেনেশুনে কোনও চোরকে সম্মান-শ্রদ্ধা দেখানো আসলেই খুব কঠিন কাজ। কিন্তু না দেখিয়ে উপায়ই বা কি? সেকালের প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু (১৮৫৪-১৯০৫) তাঁর ‘কালাচাঁদ’ উপন্যাসে এক ‘ছোটলোক’ চোরের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, “চুরি কে না করে? মিথ্যা কথা কে না কয়? বঞ্চনা কাহাতে নাই? তবে বড়লোক ধরা পড়ে না; আমার মতো ছোটলোকেই ধরা পড়ে। ছোটলোকে সিঁধ কাটিয়া চুরি করে, আর বড়লোক কথার কৌশলে, বুদ্ধির জোরে চুরি করে। আমরা অসভ্য চোর, তাহারা সভ্য চোর।”
এ উপন্যাস প্রকাশের পর কেটে গেছে ১০০ বছরের বেশি সময়, কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতি কি বদলেছে কিছু? আমার মনে হয়, তা বদলেছে অনেকখানি। সেকালে অসভ্য চোর ছিল বেশি, তারপর এই এক শতকে সভ্যতার অগ্রগতি-বিকাশের সঙ্গে-সঙ্গে বেশি হয়েছে সভ্য চোরের সংখ্যা। আজ সব দিকেই দেখতে পাই সভ্য শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত চোর। এরা চুরি করছে পণ্যবাজার শেয়ারবাজার জায়গাজমি নদী খাল বিল ব্যাংক বিশ্ববিদ্যালয় টেন্ডার নিয়োগ ভর্তি পরীক্ষা ফল। তারপর শুনছি তাদের বড় গলা। একেই বলে চুরির চুরি সিনাজুরি। আগের কালো বিড়ালদের এক কান কাটলে তারা যেতো রাসতার পাশ দিয়ে মুখ লুকিয়ে, এখনকার দু’ কানকাটা কালো বিড়ালেরা চলছে রাসতার মাঝখান দিয়ে। তাদের উদ্দেশে বলতে ইচ্ছা হয় -
‘করিব না চুরি’ কভু বলিও না আর।
কেন করিবে না চুরি, ভাবো একবার।
    উন্নতি চাহে যারা
    আগে চুরি করে তারা
চুরি করে হতে হয় নেতা জনতার
একবার চুরি নহে করো শতবার। - ‘চুরি-মাহাত্ম্য’, অমিয়কুমার মুখোপাধ্যায়

sazzadqadir@yahoo.com

বুধবার, ১০ অক্টোবর, ২০১২

কবি বাসুদেব দেব আর নেই

ষাট দশকের শীর্ষস্থানীয় কবি, সাহিত্যপত্র ‘কালপ্রতিমা’র নির্বাহী সম্পাদক, বাসুদেব দেব আর নেই। মঙ্গলবার দুপুর ০১টা ৩০ মিনিটে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
‘ষাটের স্বতন্ত্র কবি’ হিসেবে বিশেষভাবে খ্যাত বাসুদেব দেব-এর জন্ম বরিশালের হিজলতলা গ্রামে, ১৯৩৬ সালের ২০শে ডিসেম্বরে। বৃত্তিতে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সারভিসের সদস্য। অবসর নেয়ার পর ছিলেন একটি জাতীয় স্তরের স্বেচ্ছাব্রতী সংস্থার উপদেষ্টা। আর কবিতা সম্পর্কে সমালোচকরা মন্তব্য করেছেন ‘এক আবহমান জীবনের খণ্ড শোভাযাত্রা, আমাদের বহুমাত্রিক অস্তিত্বের সামান্য অনুবাদ’। তিনি নিজেও ছিলেন বহুমাত্রিক লেখক, কবিতার বাইরে ‘মানবিকতার প্রতি নিবিড় আনুগত্য’ নিয়ে বিচরণ করেছেন সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- কবিতা: একটা গুলির শব্দে, রৌদ্রের ভিতরে চিঠি, রাঙাসখী ভালো থেকো, তোমার ঘুঙুর, আরো কাছে যেতে, নাও আমাকে নাও, দেখা দাও প্রতিদিন, আমাদের আলো অন্ধকার, হেমন্ত সন্ধ্যার গান, আরো কিছু কথা, নির্বাচিত কবিতা; উপন্যাস: পুড়ে যাচ্ছে; স্মৃতিকথা: দেখাশোনা; ছোটগল্প: আমার খুব জ্বর, মাধুরীর ছাতা; প্রবন্ধ: কবিতা কালপ্রতিমা; নাটক: বারণাবতের বাড়ি, বউয়ের খুব অসুখ, নক্ষত্র ও নীবারের গান। এছাড়া রয়েছে তার কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধের বই।
কবি বাসুদেব দেবের আকস্মিক মৃত্যুতে বাংলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন কবি সাযযাদ কাদির।


বৃহস্পতিবার, ৪ অক্টোবর, ২০১২

নীরব থাকে যারা

অন্যের বাড়িতে যখন আগুন ধরে তখন অনেকে শীতের রাতে তাপ পোহাবার আরাম পায়, অনেকে সুযোগ খোঁজে মূল্যবান জিনিসপত্র হাতাবার, অনেকে মতলব করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার, অনেকে সমালোচনার ছুরি শানায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে, অনেকে চুপচাপ থাকে হাত-পা গুটিয়ে। সম্প্রতি পশ্চিম মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে  রাখাইন সম্প্রদায়ের হামলায় রোহিঙ্গ্যা মুসলমানরা হত্যা ধর্ষণ লুণ্ঠন অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়ার পর এমন একটি অবস্থাই সৃষ্টি হয় এদেশে। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গ্যাদের আশ্রয় দেয়া হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন অনেকে। আশ্রয়প্রার্থীদের তাড়িয়ে দেয়া নিয়েও বিতর্ক চলে। একটি মহল রোহিঙ্গ্যাদের বিরুদ্ধে হয়ে ওঠে অভিযোগমুখর। বিতর্কের নামে শুরু হয় ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো। ফেনিয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পও। এর মধ্যে প্রাণ হারায় ৬৫০ জন রোহিঙ্গ্যা, গুম হয় ১২০০ জন, ভিটেছাড়া হয় ৮০ হাজার। আমাদের এখানে বিতর্কে মগ্ন থাকে কয়েকটি মহল, আর কয়েকটি মহল থাকে নীরব। এর পর-পরই উত্তর-পূর্ব ভারতের বোড়োল্যান্ড  টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল-এর কোকরাঝার জেলায় শুরু হয় জাতিগত সহিংসতা। অসমিয়া মুসলমানরা এবার হত্যা ধর্ষণ লুণ্ঠন অগ্নিসংযোগের শিকার। হামলাকারীরা বোড়ো সম্প্রদায়ের। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে কোকরাঝার ছাড়িয়ে ধুবড়ি, চিরাং ও বড়পেটা জেলাতেও। আমাদের এখানে অবস্থা সেই আগের মতোই। কয়েকটি মহল সরব এবং বিতর্কে লিপ্ত। ঘৃণা, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ঘুলিয়ে ওঠে তাদের মগজে। এবারও নীরব একটি মহল। তারপর এখন আমাদের ওপর এসে পড়েছে বর্বরতা। রামু, পটিয়া ও অন্যান্য স্থানে বৌদ্ধ বসতিতে হয়েছে লুট, অগ্নিসংযোগ। হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের সামনে। তিন দিন ধরে চলেছে এ ঘৃণ্য তৎপরতা। চলেছে প্রায় বিনা বাধায়। যে বাহিনী, প্রশাসন, সরকার বিরোধীদলকে সভা সমাবেশ মিছিল মানববন্ধন এমনকি রাস্তায় পর্যন্ত দাঁড়াতে দেয় না তারা এত নির্বিকার থাকলো কিভাবে সে প্রশ্ন এখন অনেকের। এ ব্যাপারে গোয়েন্দাদের বিশ্লেষণ - ‘বেসামরিক প্রশাসন সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে রামু’র সহিংসতা ঠেকানো যেতো। পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসন পর্যাপ্ত সময় পেলেও সময়মতো যথাযথ উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।... শনিবার রাতে রামু সদরে বিক্ষুব্ধ মানুষের সমাগম বাড়তে থাকলে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেয় নি। এমনকি হামলা শুরুর দু’ ঘণ্টা আগে গোয়েন্দারা প্রশাসনকে সতর্ক করলেও তা আমলে নেয়া হয় নি। রাত সাড়ে ১১টায় গোয়েন্দা সূত্রের খবরে কঙবজার ও টেকনাফ বিজিবি এবং রামু ক্যাম্পের সেনা সদস্যরা সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে প্রস্তুত হয়ে থাকলেও সিভিল প্রশাসন তাদের কোনও সাহায্য চায় নি।... স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন অভিযুক্ত যুবককে আটক করে ঘটনার শুরুতেই বিক্ষোভের প্রশমন ঘটাতে পারতো।... এছাড়া বিক্ষোভ শুরুর তিন ঘণ্টার মধ্যেও যখন প্রশমন করা যাচ্ছিল না, তখন প্রশাসনের উচিত ছিল ১৪৪ ধারা জারি করা; কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রতায় ঘটে যায় নারকীয় ঘটনা।...” (দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ঠা অকটোবর)
ওদিকে আমাদের জাতিগত বিভাজন তো এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। তাই অন্যের ঘরে আগুন লাগলে আমরা কি-কি করি তা তো আগেই বলেছি। মনে পড়ছে জারমান যাজক মারটিন নিয়েমোয়েলার (১৮৯২-১৯৮৪)-এর কথাগুলো:
    “প্রথমে ওরা এসেছিল কমিউনিস্টদের খতম করতে
    আমি উচ্চবাচ্য করি নি, কারণ আমি কমিউনিস্ট নই।
    এরপর ওরা আসে সোস্যালিস্টদের খতম করতে
    আমি প্রতিবাদ করি নি, কারণ আমি সোস্যালিস্ট নই।
    এরপর ওরা আসে ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের খতম করতে
    আমি দাঁতে কুটোটিও কাটি নি, কারণ আমি ট্রেড ইউনিয়নিস্ট নই।
    এবার এসেছে ওরা আমাকে খতম করতে
    এখন আমার চারপাশে কেউ নেই টুঁ শব্দটি করার।”
    মারকিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারিত এ রচনায় ‘কমিউনিস্টদের’ বদলে রয়েছে ‘ইহুদিদের’ কথাটি। এখানেও দেখতে পাই সেই বিভাজন। এমন বিভাজন আজ দেশে-দেশে। আমাদের বিভাজন তো মনে হয় সব দেশকে ছাড়িয়ে। তাই পদে-পদে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেদচিন্তা আর বিভেদ-বিভাজন। অথচ সবাই জানি, একটি বিভাজিত জাতির উন্নতির আশা প্রায় দুরাশারই শামিল। জানি না এ বিভাজন থেকে কবে মুক্তি পাবো আমরা। কবে আমরা কেবল বাঙালি অসমিয়া মিয়ানমারিজ  রাখাইন রোহিঙ্গ্যা হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান চাকমা বোড়ো প্রভৃতি না হয়ে মানুষও হবো। এক হবো।

sazzadqadir@rediffmail.com

বুধবার, ৩ অক্টোবর, ২০১২

দুর্নীতি বিষয়ক যৎকিঞ্চিৎ

এক যে আছে হোমরা ও চোমরা। লেখাপড়া, চাকরি ও ব্যবসা - কোনওটাতে সুবিধা করতে না পেরে তারা পার্টি করে খায় এখন। নেতার নামে চালায় সমিতি-সংগঠন। খায় চাঁদা-তোলা তুলে। নাম কা ওয়াস্তে অনুষ্ঠান-কর্মসূচিও করে হুমকি দিয়ে অন্যদের ঘাড় মটকে। সেখানে খরচপাতি করে নামমাত্র, বাকি পুরোটাই গোঁজে ট্যাঁকে। ইলেকশন জনসভা সংবর্ধনা ইত্যাদি থাকলে ওই গোঁজার পরিমাণ বাড়ে অনেক। এ সব করে-করেই গাড়ি বাড়ি নারী সব হয় হোমরা ও চোমরা’র। সমাজ-সম্মানও হয়। আতি থেকে পাঁতি, তারপর নেতাই হয়ে ওঠে।
তাদের এ পর্যন্ত সব ওঠাই কিন্তু পাবলিকের টাকা মেরে। কাজেই ওই মারার অভ্যাস আর যায় না কিছুতে। বাকি জীবন কাটে পরেরটা খেয়ে ও মেরে। নেতা হয়ে সময়-সুযোগ পেয়ে ওই মেরে-মেরেই নমিনেশন কেনে তারা, ইলেকশন করে, জেতে, এমপি-মন্ত্রী হয়। এজন্য ট্যাঁক থেকে খসাতে হয় না কিছু, বরং এ সবই হয়ে ওঠে বড়-বড় দানে ট্যাঁকে গোঁজার উপায়। সরকারে পদ পাওয়ার পর আয়-উপার্জন আরও বাড়ে হোমরা ও চোমরা’র। সেখানে খরচ নেই, সব কিছু সরকারের। সরকারের মাল মানে তো দরিয়া মে ডাল! কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্রের অর্থ তো জনগণের অর্থ। সরকারের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী জনগণের অর্থে শিক্ষালাভ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন জনগণের অর্থে। ওই অর্থ নির্বিশেষে সকল দেশবাসীর, কোনও বিশেষ দলের নয়। এই অর্থে কোনও দলাদলি না করারই কথা, কিন্তু কাজের চেয়ে দলাদলিই  বেশি করেন তাঁদের অনেকে। এই তাঁদেরই কাজে লাগিয়ে, ব্যবহার করে আঙুল ফুলে কলাগাছ থেকে বটগাছ হয় হোমরা ও চোমরা। কোনও খরচ নেই, কেবলই আয় আর আয়। বিত্ত আর সম্পদ। ধন আর ঐশ্বর্য।
কাজ কি হোমরা ও চোমরা’র? আমলা খাটিয়ে খাওয়া। আলিশান বাড়িতে থাকা। লেটেস্ট মডেলের ঝাঁ চকচকে গাড়ি হাঁকানো। সপরিবারে দলে-বলে বিদেশে-বিদেশে ঘোরা। ফাইভ স্টার। শপিং। হাই-ফাই। ছেলেপুলে পড়ানো ইউরোপ-আমেরিকার নামী-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। দেশে বাড়ছে জনসংখ্যা, পণ্যমূল্য, গ্যাস পানি বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কোন্দল-হানাহানি, মাদকাসক্তি, রোগ-ব্যাধি, দারিদ্র্য, শ্রমিক অসন্তোষ, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, দুর্নীতি, কুশাসন, জাল-ভেজাল, চোরাকারবার, অনিয়ম, অব্যবস্থা, অনুন্নয়ন। তাতে হোমরা-চোমরার কি? তারা বিবৃতি বক্তৃতা ভাষণ দিয়ে যাচ্ছে গলা ফাটিয়ে। সাজগোজ করে যাচ্ছে সভা, সেমিনার, টিভি-বেতারে। দেশ জাতি জনগণের জন্য জানপাত করে যাচ্ছে দিন-রাত।
আসলে কি তাই? জনগণের কাছ থেকে নেয়া ছাড়া জনগণকে কখনও কিছু দেয় কি হোমরা-চোমরা? নিজেরা কি কিছু করতে পারে তারা? নিজেদের প্রচারের জন্য সরকারের বা অন্যের পত্রিকা বা বেতার-টিভি তাদের ভরসা, নিজেদের কিছু নেই ও সব। থাকলেও পাতে নেয়া যায় না সেগুলো।
হোমরা-চোমরাকে বলি, পরোপকারের নামে আর কত নিজের উপকার করবে? সত্যি-সত্যি কিছু করো পরের জন্য। নাহয় একটা ছোটখাটো রাস্তাই করো। সেতু না পারো অন্তত একটা কালভার্ট করো। লোকজনের জন্য খাবার পানির ব্যবস্থা করো বিভিন্ন ভিড়ের স্থানে। শহরে-শহরে পাবলিক টয়লেট করে দিয়ে নারী শিশু বৃদ্ধদের কষ্ট দূর করো। নোংরা জঞ্জাল আবর্জনা সরাবার ও রিসাইক্লিং করার ব্যবস্থা করলে উপকার হয়, আয়ও হয়। মানে কিছু একটা করো। সামান্য হলেও করো। দেখিয়ে দাও নিজের অর্থে নিজেরা কিছু করতে পারো।
হোমরা-চোমরা বলে, ঠিক বলেছো ভাই। এটা আমাদের মনের কথা। এটা আমরাও চাই। কিন্তু কিভাবে হাত উপুড় করতে হয় তা আগে শিখিয়ে দাও আমাদের।
বলেই কেমন আমতা-আমতা করে হোমরা-চোমরা, মনে হয় শিখলেও হবে না। আমাদের হাতেই তো উপুড় করার সিসটেম নাই! অপারেশন ছাড়া হাত উপুড় হবে না!
॥ ২ ॥
সবাই জানেন, সম্পদ অর্জনের শ্রেষ্ঠ উপায় বাণিজ্য। সেকালের পণ্ডিতেরাও বলেছেন, ধন ও ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী বাস করেন বাণিজ্যেই। তবে একালে বাণিজ্যের জন্য বণিক হওয়ার প্রয়োজন নেই। এখন যে ধরনের বাণিজ্যের রমরমা চলছে - ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, লাইসেন্স-পারমিট বাণিজ্য, শেয়ার বাণিজ্য ইত্যাদি - এ সবে যাঁরা জড়িত তাঁরা পরিচিত অন্য নামে। এখানে আসল ব্যাপার, সোজাই বলি, ঘুস দেয়া-নেয়া। ঘুস খাওয়া। এ খাওয়াটা খারাপ নয়। যদ্দূর জানি, ঘুসে কোনও ভেজাল নেই। একেবারেই খাঁটি ও বিশুদ্ধ বস্তু এই ঘুস। এতে কাঁকর, ইঁটের গুঁড়া, কারবাইড, ফরমালিন, প্রিজারভেটিভ, কেমিক্যাল, রঙ, ওয়াসা’র পানি ইত্যাদি কিছু নেই। এখানে গরুর নামে মোষের গোশত, খাসি’র নামে ছাগল-ভেড়ার গোশত, মুরগির ডিমের নামে কাছিমের ডিম খাওয়ানো চলে না। ওগুলো আছে আমাদের জন্য।
এই আমরা, যারা চলি বাঁধা আয়ে, মাসের শেষ সপ্তাহে যাদের চলতে হয় প্রায় পুরোপুরি কৃচ্ছ্রসাধন করে। এমনিতেও অভ্যস্ত আমরা ব্রেঞ্চ-এ।
ব্রেঞ্চ মানে ব্রেকফাস্ট না করে একটু আগে-আগে লাঞ্চ করা। তা সে ব্রেঞ্চেই বা কি খাই? কোনও জিনিস কি খেতে পারি নিশ্চিত মনে? কিন্তু খাই, বেঁচে থাকার আশায় বাধ্য হয়ে খাই। তারপর শুরু হয় বেঁচে থাকার যাবতীয় যন্ত্রণা। ভেজাল খেয়ে এ অসুখ ও অসুখ বাঁধিয়ে ভুগি। দামি ওষুধ কেনার ভয়ে প্রথম দিকে চলি সহ্য করে। তারপর মর-মর অবস্থা হলে ডাক্তার ও ওষুধের পিছনে যৎসামান্য যা কিছু সঞ্চয় সব ফুরিয়ে আর পথ্য জোটাতে পারি না। ফলে অসুখ আর ছাড়েও না। কিছু দিন দমে থাকে, তারপর সময় সুযোগে এমন চেপে ধরে যে দম উঠে যায় নাকে। তখন চিকিৎসা কি হবে? কিভাবে হবে? পরে দেখা যায়, এমন অসুখ বেঁধে গেছে যে লাখ-লাখ টাকা দরকার। কোত্থেকে আসবে এত টাকা? আমরা যারা ৯৯%, আমাদের সকলের অবস্থা তো একই রকম। আমাদের আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব সকলেরই তো একই দশা। তারপর সাহায্যের জন্য প্রার্থনা। সে এক মহাবিড়ম্বনা। আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়ার চেয়েও দুঃসহ হয়ে পড়ে তা কখনও।  সাহায্য পাওয়ার চেয়েও কঠিন হয়ে পড়ে সাহায্য প্রার্থনার প্রকাশ-প্রচার। ফেসবুক-এর বেশির ভাগ বন্ধুই শেয়ার পর্যন্ত করতে চায় না মানবিক সাহায্যের আবেদন। তারপর কোনওক্রমে মিডিয়ায় কিছুটা প্রকাশ-প্রচার করা গেলেও  সাহায্য সহজে জোটে না, সকলের জোটে না। যদি জুটে যাওয়ার মতো অভাবনীয় কিছু ঘটে যায়, তাহলে মরতে-মরতে বাঁচা যায় হয়তো, আর যাদের জোটে না? হাসপাতালের সিঁড়িতে বা বারান্দায়, অথবা আর্থিক অক্ষমতার এক ভয়ঙ্কর বিপন্নতায় নিমজ্জিত স্বজনের চোখের সামনে ধুঁকে-ধুঁকে মরা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে কি তাদের?
    এখন বলুন, এমন পরিণতি কি চান কেউ? সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে সম্পূর্ণ বৈধ জীবন যাপনের এমন প্রতিফল? তাহলে আপৎকালের সম্বল যোগাড় করে রাখার উপায় কি বাণিজ্য ছাড়া? বলবেন, কোন বাণিজ্য? খাঁটি, বিশুদ্ধ ও নির্ভেজাল বাণিজ্য তো ওই একটাই। ঘুস বাণিজ্য। এর বিকল্প আছে কি? আশির দশকের প্রথম দিকে, তখন আমি দৈনিক সংবাদ-এর সহকারী সম্পাদক, এক সম্পাদকীয় বৈঠকে কথায়-কথায় ‘সংবাদ’-সম্পাদক আহমদুল কবির বলেছিলেন সমঝোতার মাধ্যমে এক সমাধানের কাহিনী। ওই সময় তিনি ছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য। তাঁর এলাকার থানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘বেতনের টাকায় সংসার চলে না, কাজেই উপরি চাই... তা মাসে তোমাদের কত হলে আর উপরি লাগবে না, ডিউটি ঠিকমতো করবে, চুরি-ডাকাতি ঠেকাবে?’ হিসাব করে একটা অঙ্ক জানাবার পর এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাসে-মাসে তা জমা দিয়েছে যথাস্থানে। এতে ফল দিয়েছে, এলাকাবাসী থেকেছে নিরুপদ্রব শান্তিতে।
    ভেবে দেখুন, এমন আরও কোনও বিকল্প আছে কিনা!
॥ ৩ ॥
‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে / তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে’ - রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’ (১৯০১) কাব্যগ্রন্থের ৭০ সংখ্যক কবিতার এই দু’টি পঙ্‌ক্তি সম্ভবত সর্বাধিক উল্লিখিত বাংলা কবিতাংশগুলোর একটি। এ কথারই প্রতিধ্বনি মেলে আরেকটি উদ্ধৃতিতে - ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত’। গত শতকের ষাটের দশকে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের স্লোগান ছিল এ উদ্ধৃতিটি। তখন পোসটারে, ব্যানারে, দেয়াল লিখনে দেখা যেতো এ বিদ্রোহের আহবান। শুনেছিলাম উদ্ধৃতিটি চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও চ্যতোং (১৮৯৩-১৯৭৬)-এর। আরেকটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি মারকিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (১৭৪৩-১৮২৬)-এর -

“If a law is unjust, a man is not only right to disobey it, he is obligated to do so.”
গত ৯ই এপ্রিল রাতে পিলখানায় ৭০ লাখ টাকা নিয়ে যে ঘনঘোর নাটকের অবতারণা হয় তাতে এ সব উদ্ধৃতি মনে পড়ছিল বারবার। উদ্ভূত নাটকীয় ঘটনাই প্রমাণ করে ওই টাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক অন্যায়। সে প্রমাণ পেয়েই অনুসন্ধানে নামে মিডিয়া। আর খুব দ্রুত বেরিয়ে পড়ে থলের কালো বিড়াল। দেখা যায়  ‘রেলগাড়ি ঝমাঝম... পা পিছলে আলুর দম’ গোছের এক কাহিনী। রেলের ট্রেড অ্যাপ্রেনটিস পদে ১৬ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের এক অংশ ওই ৭০ লাখ টাকা। সে অন্যায়ে বহু পক্ষ জড়িত। নিয়োগদাতা, নিয়োগপ্রার্থী, তদবিরকারী, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও আছেন তাঁরা - যাঁদের না দিয়েথুয়ে বড় দাঁও মেরে  ভূরিভোজ করা যায় না।
     রেল নতুন মন্ত্রণালয়। তাই বলে দুর্নীতির ব্যাপারস্যাপার নতুন নয় এখানে। এ মন্ত্রণালয় আগে ছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অংশ। তখন দুর্নীতি সংক্রান্ত ঘাপলা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যন্ত জানাজানি হওয়ায় পদ্মা সেতুর নির্মাণ হয়ে যায় অনিশ্চিত। এর আগে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপার নিয়ে ঘটে নানা তুলকালাম। এক দুর্ঘটনায় দু’জন খ্যাতিমান ব্যক্তির প্রাণহানির সূত্রে মিডিয়ায় আসে তাদের সে সব কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি। তবে এসব কি কেবল রেলে বা যোগাযোগে চলছে? অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে এদিক-সেদিক কিছু নেই?
    উপন্যাসের পাঠকরা বা টিভি-নাটকের দর্শকরা জানেন, এখন সবচেয়ে ভাল ফরমুলা হচ্ছে - অস্বাভাবিক লোকজনদের নিয়ে উপন্যাস-নাটক লেখা। নায়ক-নায়িকা, মা-বাবা থেকে কাজের লোক বা বুয়া সবাই কথাবার্তা বলবে অদ্ভুত-অদ্ভুত, কাজকর্ম করবে আরও অদ্ভুত-অদ্ভুত অর্থাৎ উপন্যাস বা নাটকের সকল চরিত্রকে চলনে বলনে হতে হবে পাগলা বা পাগলাটে। তাহলেই উপন্যাস হট কেক, টিভি নাটক সুপার হিট। এ রকম হট বা হিট করার ফরমুলা আগেও ছিল। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন  ‘পল্লীসমাজ’ (১৯১৬)-এ সবাই খারাপ, কেবল ‘রমা’ ও ‘রমেশ’ ভাল। কথাটির অর্থ, উপন্যাসে শরৎচন্দ্র  সমাজের শতেক দোষ-ত্রুটি দেখালেও নায়ক ও নায়িকাকে রাখতেন প্রায় দেবোপম নিষ্কলঙ্ক। বাস্তবে এমন তো হতে পারে না। কোনও সমাজে মাত্র দু’জন ভাল লোক থাকতে পারে না, যদি ৯৮ জন মানুষ খারাপ হয়। সে রকম কেবল রেল-যোগাযোগ খারাপ আর বাকি সকল মন্ত্রণালয় ভাল - এমন হতে পারে কি? কিন্তু সবার উপরে রাজনীতি। তাই বলছি, সকল শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে পিলখানায় পাওয়া ৭০ লাখ হতে পারে সাদা বিড়াল। সে ম্যাঁও শোনা গেছে এরই মধ্যে। আমার প্রিয় কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেই কবে লিখেছেন - “রূপসী তুই রাজনীতি, দিস্‌ ছেলে-ছোকরাদের মাথা ঘুরিয়ে; কিন্তু বুড়ো শয়তানদের সঙ্গে থাকিস্‌ রাত্রে শুয়ে।” তাহলে এই নোংরা রাজনীতি ঠেকাবার উপায় কি? একটাই উপায়। ৯৯ ভাগের বাঁচার রাজনীতি।
॥ ৪ ॥
ম্যাটরিকুলেশন, সংক্ষেপে ‘ম্যাটরিক’, পরীক্ষা চালু করেছিল বৃটিশ রাজ, এর সমাপ্তি ঘটে ১৯৬২ সালে। আমার মনে আছে, কারণ এ পরীক্ষা আমি দিয়েছিলাম ওই বছর। এর পর, ১৯৬৩ সাল থেকে, চালু হয় সেকেন্ডারি স্কুল সারটিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা। কেটে গেছে প্রায় ৫০ বছর, কিন্তু এখনও সবার মুখে-মুখে চালু আছে ম্যাটরিক পরীক্ষা, এসএসসি কথাটা আর মুখে আসে না কারও। এ রকম অনেক কিছুই বদলে গেছে, কিন্তু আগেরটাই আঁকড়ে ধরে আছি আমরা। নতুনের প্রতি নেতি আর পুরনোর প্রতি প্রীতি কি আমাদের জাতীয় রক্ষণশীলতারই এক বৈশিষ্ট্য? মারকিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম প্রেসিডেন্ট (১৯৩৩-১৯৪৫) ফ্রাঙ্কলিন ডিলানো রুজভেল্ট (১৮৮২-১৯৪৫) বলেছেন, রক্ষণশীলদের পা দু’টো থাকে চমৎকার ? তবে তারা সামনের দিকে চলা শেখে না কখনও। সম্ভবত এ জন্যই ভাষা-ভাষা বলে প্রাণ দিলেও বানান শিখি না, শেখার চেষ্টাও করি না। প্রমিত বানান তো নয়ই। ও সব জানতেও চাই না। ‘ঘুষ’ বানানটি যে ‘ঘুস’ হওয়া উচিত তা বলা হয়েছে অনেক আগে। হিন্দি ‘ঘুস’ থেকে আসা এ অ-তৎসম বিদেশী শব্দের বানান বাংলায় ‘ঘুস’ হওয়ারই কথা। বাংলা একাডেমীর ‘বাংলা বানান-অভিধান’ (পুনর্মুদ্রণ, ১৯৯৫) এ বানানটিই নির্দেশ করেছে, কোনও বিকল্প দেয় নি। তবে ঘুষের সঙ্গে ঘুষাঘুষির একটা ব্যাপার আছে বলেই হয়তো হিন্দি ‘ঘুস’ বাংলায় হয়ে গেছে ‘ঘুষ’। তবে ওই অভিধানে ‘ঘুষি’ ও ‘ঘুষাঘুষি’ও  বিকল্পহীন ‘ঘুসি’ ও ‘ঘুসাঘুসি’। তবে বানান যা-ই হোক ঘুসের অনেক কদর সমাজে। ভাষাতেও। তাই কত নামে ঘুসকে ডাকি আমরা ? উৎকোচ, উপরি, বখশিশ, সেলামি, টু-পাইস, হাতটান, লেনদেন, বাঁ হাতের কামাই, খুশি করা, প্রণোদনা, নজরানা, রিসওয়াত, গোপন পারিতোষিক, গেটিস...! ইংরেজদের কাছেও এর কদর অনেক। ওদের ভাষাতেও অনেক নাম ?
Ò tip, gift, sop, perk, skim, favor, discount, waived fee/ticket, free food, free ad, free trip, free tickets, sweetheart deal, kickback/payback, funding, inflated sale of an object or property, lucrative contract, donation, campaign contribution, fundraiser, sponsorship/backing, higher paying job, stock options, secret commission, or promotion (rise of position/rank)...! Ó আরও অনেক রকম ঘুস আছে। মারকিন নাট্যকার থর্নটন ওয়াইল্ডার (১৮৯৭-১৯৭৫) বলেছেন, বিয়েটাও ঘুষ। এ ঘুষ পেলে বাঁদী নিজেকে বেগম ভাবে।
    তবে ঘুস নিয়ে সামপ্রতিক এক ঘুসাঘুসি জাতীয় ঘটনার খবর জেনেই এত সব কথা বললাম। রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুক তালুকদারের গাড়ি থেকে ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার হয়েছে গাড়িচালক আলী আজমের আকস্মিক তৎপরতায়। গাড়িতে আরও ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের জিএম ইউসুফ আলী মৃধা ও রেলওয়ে পুলিশের কমান্ডেন্ট এনামুল হক। ১৬ কোটি টাকার ঘুস-বাণিজ্যের একটা ভাগ ওই টাকা। ধরা পড়ার পর ঘুসের টাকা ভাগ-বাটোয়ারার নানা কাহিনী ফাঁস হয়ে পড়ছে মিডিয়ায়।  এ দেশে এ সব ওপেন সিকরেট। তারপরও এমন ঘটনা যে কেন ঘটে! আসলে ঘুস জিনিসটা দিয়ে-থুয়ে খাওয়াই ভাল। তা করলে গাড়িচালক আজমকে হজম করা কঠিন হতো না কিছু। রাজনীতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এখন। নেতা হতে, মন্ত্রী-এমপি হতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় মানে কাঠখরচ করতে হয়। দলের সদস্য হওয়া, তারপর পদ পাওয়া, নির্বাচনে মনোনয়ন জোটানো, জিতে এমপি হওয়া, মন্ত্রীত্ব বাগানো ? এগুলো সহজ কম্ম নয়। কোটি-কোটি-কোটি কাঠখরচ। সে খরচ আসে কোত্থেকে? আসবে কোত্থেকে? রাজনীতিতে হোমরা-চোমরাদের টাকা তো এভাবেই আসে। আর কোনও ভাবে আসে নাকি?
॥ ৫ ॥
দেশের অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচারের কথা প্রায়ই শুনি। মানি লন্ডারিং-এর অভিযোগ অনেকের বিরুদ্ধে। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আমলা, চোরাকারবারিদের অনেকে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ছে - এমন কথা এখন নিয়মিত আইটেম হয়ে পড়েছে বক্তৃতা-বিবৃতির। উচ্চারিত হচ্ছে কত জনের নাম। ১০ বছর আগে প্রণীত হয়েছে প্রিভেনশন অভ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট, ২০০২ (অ্যাক্ট নং ৭ অভ ২০১২)। এ অ্যাক্টের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক এ পর্যন্ত জারি করেছে ২৬টি সারকুলার। এর মাধ্যমে ব্যাঙ্কিং সেক্টরে নিশ্চয়ই চলছে কড়াকড়ি প্রতিরোধমূলক তৎপরতা, কিন্তু হুন্ডি বন্ধ হয় নি বলেই শোনা যায়। সেই ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আই এম এফ) অনুমান করেছিল, বিশ্ব অর্থনীতির ২ থেকে ৫ ভাগ অর্থ লন্ডার করা। তবে আন্তঃসরকার সংগঠন ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স অন মানি লন্ডারিং  (এফ এ টি এফ) বলেছে, এই অর্থের হিসাব করা সম্ভব নয়। এজন্য এ সংক্রান্ত কোন অনুমান বা ধারণা তাঁরা প্রকাশ করেন নি আর।
    অর্থ-সম্পদের অবৈধ পাচার বা চালান ঠেকানোর পাশাপাশি চলছে সে সব উদ্ধারের নানা তৎপরতা। বিদেশে যাঁরা আলিশান বাড়ি বানিয়ে বা কিনে, রমরমা ব্যবসা বাগিয়ে লেটেস্ট মডেলের আউডি বা মাসেরাতি হাঁকিয়ে বেড়ান তাঁদের সুলুক-সন্ধান নিয়ে পাচার করা সম্পদ উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন দেশে। কারণ দুর্নীতিবিরোধী সংগ্রামে আন্তর্জাতিক পূর্বিতা যে লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধার তা সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ করা হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী জাতিসংঘ সম্মেলন (২০০৩)-এর পঞ্চম অধ্যায়ে। ওই সম্মেলনেই গঠিত হয় ইউনাইটেড নেশনস্‌ কনভেনশন এগেনস্ট করাপশন (ইউ এন সি এ সি)। এটি কার্যকর হয় ২০০৫ সালের ১৪ই ডিসেম্বর থেকে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সহ ১৪০টি দেশ স্বাক্ষর করেছে এতে। সম্পদ উদ্ধারে নিয়োজিত আছে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনের মধ্যে রয়েছে - ইউনাইটেড নেশনস্‌ অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম (ইউ এন ও ডি সি), স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভ (বিশ্ব ব্যাঙ্ক) (এসটি এ আর), ইনটারন্যাশনাল সেনটার ফর অ্যাসেট রিকভারি (আই সি এ আর), দি ইনটারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর অ্যাসেট রিকভারি (আই এ এ আর), অরগানাইজেশন ফর ইকনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ও ই সি ডি), ট্রান্সপারেন্সি ইনটারন্যাশনাল (টি আই), ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফ এ টি এফ), ইউ৪ অ্যানটি-করাপশন রিসোর্স সেনটার (ইই৪) প্রভৃতি। এছাড়া আঞ্চলিক পর্যায়ে আইন, বিচার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের রয়েছে চোরাই সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ।
    উল্লিখিত সংস্থা-সংগঠনের উদ্যোগের ফলেই নাইজেরিয়ার সামরিক একনায়ক জেনারেল সানি আবাচা (১৯৯৩-৯৮)-র লুণ্ঠিত ৬০ কোটি ডলার বাজেয়াপ্ত করে সুইজারল্যান্ড। পরে সে অর্থ উন্নয়ন-কাজে ব্যয় হয় বিশ্ব ব্যাঙ্কের তদারকে। এছাড়া সুইজারল্যান্ড বাজেয়াপ্ত করেছে জায়ারে’র সাবেক প্রেসিডেন্ট  মোবুতো সেসে সেকো (১৯৬৫-১৯৯৭) ও কেনিয়া’র সাবেক প্রেসিডেন্ট দানিয়েল আরাপ মোই-এর বিপুল অর্থ। ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফারদিনান্দ মারকোস (১৯৬৫-৮৬)-এর বহু সম্পদ ফিরে পেয়েছে দেশ। পেরু’র সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবেরতো ফুজিমোরি (১৯৯০-২০০০)-র ডান হাত ভ্লাদিমিরো লেনিন মনতেসিনোস তোরেস-এর পাচারকৃত অর্থ থেকে ১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার উদ্ধার করেছে আইসিআর। হেইতি’র সাবেক প্রেসিডেন্ট জাঁ-ক্লদ ‘বেবি ডক’ দুভালিয়ার (১৯৭১-১৯৮৬), ইউক্রেন-এর সাবেক প্রধানমন্ত্রী পাভলো লাজারেঙ্কো (১৯৯৬-৯৭), নাইজেরিয়া’র প্ল্যাটো স্টেট-এর সাবেক গভর্নর জোশুয়া দারিয়ে (১৯৯৯-২০০৭) ও বায়েলসা স্টেট-এর সাবেক গভর্নর দিয়েপ্রিয়ে আলামিয়েসেইগা (১৯৯৯-২০০৫), ইন্দোনেশিয়ার ব্যাঙ্কার হেনদ্রা রাহারদজা, চীনের মাকাউ-এর পরিবহন ও পূর্ত বিভাগের প্রথম সচিব আও মান লোং (১৯৯৯-২০০৬) প্রমুখ কর্তৃক অপহৃত সম্পদ উদ্ধার করা হয়েছে অনেকখানি। বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডও হয়েছে ক’জনের।
অপহরণ ও উদ্ধার সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য এখানে তুলে ধরার উদ্দেশ্য একটাই - যাঁরা আমাদের দেশের অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন, করছেন এবং করবেন বলে ভাবছেন - সেই লুটেরাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। দুর্নীতি করে যে পার পাওয়া যায় না সবসময় সে প্রমাণ আছে অনেক। পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি থেকে সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক কেলেঙ্কারি আজ আর অজানা নয় কারও। ট্রান্সপারেন্সি ইনটারন্যাশনালের র‌্যাংকিং-এ তো দশক ধরেই আছি শীর্ষে আমরা। কাজেই সরকারে-প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রকৃত স্বাধীন, জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত  দুর্নীতির কালো বিড়াল দিনে-দিনে বাঘ-সিংহের আকারই ধারণ করবে। অসট্রিয়া’র চিন্তাবিদ কার্ল ক্রাউস (১৮৭৪-১৯৩৬) লিখেছেন,
“Corruption is worse than prostitution. The latter might endanger the morals of an individual, the former invariably endangers the morals of the entire country.” এ অবস্থায় জেঁকে বসা স্বৈরতন্ত্র ও চৌর্যতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ছাড়া আর কি বিকল্প আছে দেশবাসীর সামনে?



sazzadqadir@gmail.com


বৃহস্পতিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১২

গুগলে গণ্ডগোল

‘ইনোসেন্স অভ মুসলিমস্‌’  নামে গুগল নিয়ন্ত্রিত ইউটিউব-এ প্রচারিত ১৩ মিনিট ৫১ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপটি ঘরোয়া ভাবে নির্মিত। এর লেখক ও প্রযোজক স্যাম বাসিল ওরফে নাকুলা বাসেলি নাকুলা। বলা হয়েছে, ক্লিপটি আসলে মূল ছবির প্রচারচিত্র (ট্রেলার)। সে ছবির অবশ্য কোনও খোঁজ মেলে নি এখনও। একটি খবরে বলা হয়েছে, গত ২৩শে জুন হলিউড-এর ভাইন থিয়েটারে একবারই প্রদর্শনী হয়েছে ছবিটির। তখন পোসটারে এর নাম ছিল ‘ইনোসেন্স অভ বিন লাদেন’। প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১০জন দর্শক। জুলাই মাসে ভিডিও ক্লিপটি ইউটিউব-এ আপলোড করা হয় ‘দ্য রিয়াল লাইফ অভ মুহাম্মদ’ ও ‘মুহাম্মদ মুভি ট্রেলার’ নামে। এর আরবি ভার্সন আপলোড করা হয় সেপটেম্বরের গোড়ার দিকে। তখন ইমেইল-এর মাধ্যমে এর প্রচারে ভূমিকা রাখেন মিশরি-মারকিন কপটিক খ্রিস্টান আইনজীবী ও আন্দোলনকর্মী মরিস সাদেক। তিনি ঘোরতর ইসলাম-বিদ্বেষী হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। নির্মাণকালে ছবিটির নাম ছিল ‘ডেজার্ট ওয়ারিয়র’। শিল্পীদের বলা হয়েছিল, দু’ হাজার বছর আগে আকাশে ধূমকেতুর আবির্ভাবে গোত্রে-গোত্রে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার কাহিনী নিয়ে তৈরি হচ্ছে ছবিটি। চিত্রায়নের পর শিল্পীদের না জানিয়ে ওভারডাবিং করে ইসলাম-বিদ্বেষী বিষয়বস্তু ঢোকানো হয় এতে। ছবিটির প্রচারে মুখ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন আমেরিকায় কোরান পোড়ানো আন্দোলনের নেতা প্যাস্টর টেরি জোন্স। তবে মুসলিম পাবলিক এফেয়ার্স কাউন্সিল-এর মরিয়ম মহিউদ্দিন বলেছেন, মূল ছবির কোনও অস্তিত্বই নেই। আমরা তন্ন-তন্ন করে খুঁজেছি অনেক, কিন্তু মেলে নি কিচ্ছু।
    ভিডিও ক্লিপের বিষয়বস্তু ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে মুসলিম বিশ্ব। প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছে সর্বত্র। সহিংসতা-প্রাণহানি ঘটেছে, রয়েছে আরও ঘটার আশঙ্কা। কিন্তু গুগল কর্তৃপক্ষ রাজি নন ইউটিউব থেকে ট্রেলারটি সরিয়ে দিতে। বিশ্বব্যাপী দাবি ওঠা সত্ত্বেও তাঁরা বলছেন, এতে ক্ষুণ্ন হবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা - লঙ্ঘন করা হবে মারকিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী। (“In the United States, a law against blasphemy, or a prosecution on that ground, would violate the American Constitution. The First Amendment to the United States Constitution provides ‘Congress shall make no law respecting an establishment of religion, or prohibiting the free exercise thereof; or abridging the freedom of speech, or of the press...’ while there are no federal laws which forbid ‘religious vilification’ or ‘religious insult’ or ‘hate speech’, some states have blasphemy statutes.”)
    ভিডিও ক্লিপটি সম্পর্কে সকল মারকিন পত্রপত্রিকায় প্রায় একই ভাষায় লেখা হয়েছে, এটি অত্যন্ত কাঁচাভাবে নির্মিত একটি কদর্য ছবি। সে ক্ষেত্রে বলতে হয়... গুগল কর্তৃপক্ষ প্রকাশের স্বাধীনতার নামে জেনেশুনেই প্রশ্রয় দিচ্ছে উচ্ছৃঙ্খলতা, অশ্লীলতা ও বিকৃত আচারকে। এ প্রশ্রয়ের ফল মারাত্মক হতে বাধ্য। এর পর থেকে যে কোনও উৎসাহী ব্যক্তি যা ইচ্ছা তা-ই ভিডিও আকারে আপলোড করতে পারবে ইউ-টিউবে। তাহলে তো জনপ্রিয় এ মাধ্যমটি ক্রমশ পরিণত হবে ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসা, আক্রোশের এক জঘন্য হানাহানি-স্থলে। প্রকাশের স্বাধীনতার অজুহাতে এমন বিশৃঙ্খলা ও বিকৃতির স্বাধীনতা দেয়া কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়?
    ‘ইনোসেন্স অভ মুসলিমস্‌’-এর অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও অভিযোগ করেছেন, তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে নির্মাতারা। এ প্রতারণা কি ক্ষুণ্ন করে নি শিল্পীর অধিকারকে? মানবাধিকারকে?
    এরই মধ্যে ইউটিউব-এ বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক ভিডিও আপলোড করে নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন করায় ব্রাজিলের এক বিচারপতি ওই দেশের গুগল-কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে অবশ্য আপিল করেছে গুগল। কিন্তু তাদের স্বাধীনতার ব্যাখ্যা যে ভবিষ্যতে এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বারবার তাতে সন্দেহ নেই কোনও। তবে আমাদের বিশেষ ভাবে দেখতে হবে, আমরা যেন এমন কিছু না করি যাতে ‘ইনোসেন্স অভ মুসলিমস্‌’-এর নির্মাতাদের মতলব হাসিল হয়ে যায় অবলীলায়। কাঁচা হোক, কদর্য হোক... তারা তো বিশেষ দুরভিসন্ধি নিয়েই করেছে দুষ্কর্মটি?

sazzadqadir@gmail.com

মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ: সাহিত্যিক-সাংবাদিক

[কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ: ২৪.০৯.১৯২১ - ২৬.০৩.১৯৭৫]

শিশুতোষ বইপত্র পড়ে-পড়েই আমরা অনেকে ‘বইয়ের পোকা’ হয়েছি সেই ছোটবেলায়। আর আমাদের এই পোকা বানিয়ে দেয়ার জন্য যে সব বই দায়ী সেগুলোকে ভুলি নি কখনও। সেই সঙ্গে ভুলি নি ওই সব বইয়ের লেখকদেরও। তাঁরা জীবনভর প্রিয় হয়ে রয়েছেন আমাদের। এজন্যই এখনও  খুঁজে বেড়াই হারানো দিনের বইপত্র। কখনও হঠাৎ খুঁজে পেয়ে গেলে পড়তে-পড়তে পাতা ওলটাতে-ওলটাতে ফিরে যাই সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে। সে সব দিনের এমন অনেক প্রিয় লেখকের একজন কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ। শিশুতোষ মাসিক ‘খেলাঘর’ (১৯৫৪-?)-এর মাধ্যমে তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় আমার। তাঁকে মনে রাখার আরও বিশেষ কারণ - নানা বিচিত্র বিষয়ে লিখতেন তিনি। এছাড়া বিদেশী সাহিত্যের প্রতি আমার মতে অনেকের কৌতূহল ও আকর্ষণ যাঁরা উসকে দিয়েছেন তিনি তাঁদেরই একজন। এদেশের কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদান ছাড়াও সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদের - কিন্তু সে সবের যথাযথ মূল্যায়ন এখনও বাকি। অনেক বই লিখেছেন তিনি, কিন্তু সেগুলোর মুদ্রণ নেই দীর্ঘ দিন ধরে। তাঁর রচনাবলি প্রকাশের কোনও উদ্যোগ আছে বলেও জানা যায় না।
    কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদের জন্ম পাবনা’র চাটমোহর-এ, ১৯২১ সালের ২৫শে সেপটেম্বর। পৈতৃক নিবাস মানিকগঞ্জের কলতা গ্রামে। পিতা কাজী আফাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন কৃতী পুলিশ কর্মকর্তা (দারোগা)। বৃটিশ সরকার ‘খানসাহেব’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছিল তাঁকে। দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান প্রভৃতি নানা বিষয়ে গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। অবসর-জীবনে লিখেছিলেন ‘বৈদ্যুতিক দর্শনে কোর-আন শরীফ’ (১৯৪৯) গ্রন্থটি। কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদের ছোট দুই ভাই কাজি আজাহার উদ্‌দিন আহমদ ও কাজি আতাহার উদ্‌দিন আহমদ-ও লেখক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন এক সময়।
কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদের শিক্ষাজীবনের শুরু মানিকগঞ্জের ভিকটোরিয়া হাই স্কুলে। এরপর পড়েছেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে (১৯৩৪)। মাঝে আরও কয়েকটি স্কুলে পড়ার পর ১৯৩৭ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে। সেখানে অষ্টম থেকে নবম শ্রেণীতে ওঠার পর-পরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ইতি ঘটে তাঁর। এরপর কলকাতায় গিয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি। পাশাপাশি আত্মনিয়োগ করেন গল্প-উপন্যাস রচনায়। পরে সাংবাদিকতাকে ছাড়িয়ে কথাসাহিত্যিক পরিচয়টিই প্রধান হয়ে ওঠে তাঁর।
    কলকাতায় ১৯৪১-৪৬ সালে কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ সম্পাদক-প্রকাশক ছিলেন দ্বিমাসিক সাহিত্যপত্রিকা ‘মৃত্তিকা’র। মাঝখানে কয়েক বছর সম্পাদনার সূত্রে জড়িত ছিলেন মাসিক ‘সওগাত’, ‘শিশু সওগাত’, সাপ্তাহিক ও দৈনিক ‘কৃষক’ ও সাপ্তাহিক ‘দেশের কথা’-র সঙ্গে (১৯৪৩-১৯৪৪)। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন মাসিক ও সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’র (১৯৪৫-১৯৪৭)। ভারত-বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের সর্বপ্রথম দৈনিক সংবাদপত্র “জিন্দেগী”র প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন তিনি। পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ৪ঠা সেপটেম্বর। দৈনিক ‘ইনসাফ’-এরও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন তিনি। কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ পরে যোগ দেন সরকারের তথ্য বিভাগে সিনিয়র সাব-এডিটর পদে। তখন সম্পাদনা করেছেন সাপ্তাহিক পাক সমাচার (১৯৫১-১৯৭১)। স্বাধীনতার পর সম্পাদনা করেন শিশু-কিশোর সাময়িকী “নবারুণ”। এ ছাড়া স্ত্রী জেবু আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত দেশের বিখ্যাত ও প্রাচীন শিশু-কিশোর মাসিক “খেলাঘর”-এর নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাঁর। এ পত্রিকা ছাপা হতো তাঁদের ৯ নয়া পল্টনের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত জেসমিন প্রিন্টিং প্রেস থেকে। ষাটের দশকে ত্রৈমাসিক ‘মৃত্তিকা’, দ্বিমাসিক ‘স্বদেশ’, মাসিক ‘অবসর’ প্রভৃতি পত্রিকার সম্পাদনা-প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ।
সুলেখিকা জেবু আহমদ-এর আসল নাম বেগম জেবুন্নেসা আহমদ। সিলেটের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান তিনি। তাঁর বৈমাত্রেয় বড় ভাই  করাচি থেকে প্রকাশিত ‘ডন’ পত্রিকার বিখ্যাত সম্পাদক আলতাফ হুসাইন (১৯০০-১৯৬৮) - যিনি পাকিস্তানের শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ দফতরের মন্ত্রীও ছিলেন ১৯৬৫-১৯৬৮ সালে।
১৯৩৭-৪৭ সালে পিতার কর্মস্থল কলকাতায় অবস্থানকালে কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ লেখালেখি করতেন ‘আলোক দূত’, ‘কুমার নিখিলেশ রুদ্রনারায়ণ সিং’, ‘কুমারী প্রীতিসুধা সিং’, ‘অরূপ আহমদ’ প্রভৃতি ছদ্মনামে। ‘আলোক দূত’ নামে প্রকাশিত হয় তাঁর কিশোর উপন্যাস “মুক্তোর সন্ধানে আফ্রিকায়”। প্রকাশ করে কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা দেব সাহিত্য কুটীর। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫-১৬ বছর, তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র। কলকাতা-জীবনে কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ বেশি পরিচিতি পেয়েছিলেন কুমার নিখিলেশ রুদ্রনারায়ণ সিং নামে। পরে সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮)-এর পরামর্শে তিনি লিখতে শুরু করেন স্বনামে।
“মুক্তোর সন্ধানে আফ্রিকা” ছাড়া গ্রন্থাকারে প্রকাশিত কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদের উপন্যাসের সংখ্যা ৮ - ‘চর ভাঙা চর’ (১৯৫১), ‘কলাবতী কন্যা’ (১৯৫২), ‘কবীর লস্কর’ (১৯৫৪), ‘বাতাসী’ (১৯৫৬), ‘নোনা পানির ঢেউ’ (১৯৫৮), ‘অমর যৌবনা’ (দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৫৮), ‘সুরের আগুন’ (১৯৬০), ‘নীড় ভাঙা ঝড়’ (১৯৬১)। পত্রিকায় প্রকাশিত কিন্তু গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে - ‘হাসিনার প্রার্থনা’, ‘গদ্য কবিতা’ ও  ‘মরণ ছবির বিভীষিকা’। তাঁর গল্পগ্রন্থ - ‘কোলাহল’ (১৯৪৭), ‘কালনাগিনী’ (১৯৫২), ‘জ্বালাও আলো’ (১৯৫৪), ‘নূতন প্রেম’ (১৯৫৫), ‘নদী ধলেশ্বরী’ (১৯৭০); প্রবন্ধ-গবেষণা - ‘সাহিত্যের পরিধি’ (১৯৬০), ‘ইনকিলাবী যুগের ইতিকথা’ (১৯৭০), ‘সাহিত্য ও জীবন’ (১৯৭০), ‘আঙুর’ (১৯৭০), ‘আমরাও বসে থাকিনি’ (১৯৭০); অনুবাদ - ‘মুসলিম রাজনীতির ঐতিহাসিক পটভূমি’ (১৯৪৫), ‘টেলিফোন’ (১৯৫৭), ‘লেবানন থেকে পাকিস্তান’ (১৯৭০); নাটক - ‘মোগল কুমারী’ (১৯৪৭)।
কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদের বেশির ভাগ উপন্যাসেরই একাধিক সংস্করণ হয়েছে সেকালে। ষাটের দশকে পাঠকপ্রিয়তার তালিকায় ছিল ‘চর ভাঙা চর’, ‘বাতাসী’, ‘নোনা পানির ঢেউ’, ‘অমর যৌবনা’, ‘নীড় ভাঙা ঝড়’। তবে তাঁর প্রথম উপন্যাস “চর ভাঙা চর”ই (১৯৫১) সর্বাধিক আলোচিত উপন্যাস । মাহবুব-উল-আলম লিখেছেন, “... লেখার সুরে কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ বহুকাল হইতে আমার আত্মীয়। তাঁহার ‘চর ভাঙা চর’-এও রহিয়াছে শক্তির প্রকাশ।... ‘চর ভাঙা চর’ পড়িতে পড়িতে আমার বহুবার মনে হইয়াছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালিন্দী’ ও ‘পঞ্চগ্রাম’কে। ধলেশ্বরী ও সপ্তগ্রামের অপরূপ রূপ কাজি সাহেব দেখিতে পাইয়াছেন।...” অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬) লিখেছেন, “... ‘চর ভাঙা চর’ পড়ে খুব তৃপ্তি পেলাম। পূর্ববঙ্গের প্রাণবতী নদী আর উদার উদ্ধত মানুষ চিরকাল আমার মন ভুলিয়েছে। - তারই সৌন্দর্য আর সৌরভ পেলাম আপনার বইয়ে। পূর্ববঙ্গে নিয়ে লেখা বই পূর্ববঙ্গের মতোই মধুর।...” সাপ্তাহিক দেশ লিখেছে, “... ‘চর ভাঙা চর’ এক বলিষ্ঠ নতুনতম পদক্ষেপ। আমাদের জীবনে কাহিনী নেই, অথবা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের বাইরে গল্পের উপকরণ নেই বলে অক্ষম লেখকেরা পালিয়ে থাকতে চান, তাঁদের সামনে এক নতুন দিগন্তের ইশারা এই ‘চর ভাঙা চর’...।” মোহাম্মদ মাহ্‌ফুজউল্লাহ্‌ লিখেছেন, “কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদের রচনায়ও ভিন্নতর পটভূমিতে নদী-নালা পরিবেষ্টিত গ্রাম-বাংলার জীবনের রূপায়ণ লক্ষ্য করা গেছে। শামসুদ্দীন আবুল কালাম যেখানে নদী-কেন্দ্রিক গণজীবনের গতিময় রোমান্স-রূপ অঙ্কন করেছেন, সেখানে কাজি আফসার উদ্‌দিন অঙ্কন করেছেন নদীর ভাঙনধারার পটভূমিতে জীবন-সমস্যার বাস্তবচিত্র। অবশ্য তাঁর ‘চর ভাঙা চর’ উপন্যাসে ভাবাবেগ অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতাবোধকে বিনষ্ট করে দিয়েছে, ফলে সেখানে নদীর ধ্বংসলীলা এবং গতিময় বন্যাবেগই কবিত্বময়তার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে, নদী কেন্দ্রিক জনজীবন অনেকখানি চাপা পড়ে গিয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর ‘চর ভাঙা চর’ একটি স্বাতন্ত্র্যধর্মী রচনা।...”
ষাটের দশকে বহুল পঠিত লেখক ছিলেন কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ। উপন্যাসের মতো তাঁর ছোটগল্প ও শিশুতোষ রচনাও ছিল যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়। অনেক বিখ্যাত বিদেশী গ্রন্থের অনুবাদ / ভাবানুবাদ করেছিলেন তিনি কিশোরদের উপযোগী করে। সেগুলো পড়েই দেশের বহু শিশু-কিশোর পরিচয় ও স্বাদ-গন্ধ পেয়েছে বিশ্বসাহিত্যের। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে - ‘খাইবারের ভয়ঙ্কর’ (১৯৫৪), ‘গ্রেট এঙপেকটেশন’, ‘কিডন্যাপড্‌’, ‘সাইলাস মারনার’, ‘জীবনশিল্পী শেখভ’ (১৯৫৫), ‘রহস্যময় বন্দী’, ‘মৃত্যুর অভিশাপ’, ‘টম ব্রাউনের ছেলেবেলা’ (১৯৫৬), ‘টেলিফোন’ (১৯৫৭), ‘গ্রীন ম্যান্‌সন্‌স’, ‘বিশ্বত্রাস চেঙ্গীস খান’ (১৯৫৯), ‘শাশ্বত মনীষা’, ‘মিডশিপম্যান ইজি’ (১৯৬০), ‘দ্য হারিকেন’, ‘মবি ডিক’, ‘মিউটিনি অভ দ্য বাউন্টি’, ‘দুই নগরীর উপাখ্যান’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘ব্ল্ল্যাক বিউটি’, ‘দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার’, ‘জীবন যেখানে জাগলো’ (১৯৭০) প্রভৃতি। তাঁর অপ্রকাশিত রচনার সংখ্যাও বিপুল বলে জানা যায়।
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হিসেবে কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ সেকালে যথেষ্ট সমাদৃত ছিলেন, কিন্তু একালে তিনি অবহেলিত, অনালোচিত, উপেক্ষিত। তাঁর সাহিত্যকৃতির সেভাবে কোনও মূল্যায়ন হয় নি এখনও। তাই বলে তাঁর সাধনা একেবারে বৃথা গেছে বলে আমি মনে করি না। আমাদের কথাসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর যথাযোগ্য স্থান নির্ধারিত আছে অবশ্যই। সেই স্থানের সীমাচি??হ্ন ছাড়া যে আমাদের সাহিত্যের কথকতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তা অস্বীকার করতে পারেন না কেউ।
কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ লিখেছেন অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে। ছোট-ছোট বাক্যে তরতরিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন কাহিনী, সংলাপ, বিবরণ। পাঠকও তাই তাঁর সঙ্গে এগিয়ে যায় সমান গতিতে। তাঁর এই রচনারীতিতে প্রভাব লক্ষ্য করা যায় সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় (১৮৮৪-১৯৬৬) ও নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (১৯০৫-১৯৬৪)-এর। জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২)-ও অনুপ্রাণিত ছিলেন এ রীতিতে। একালের ‘নন্দিত’ লেখকদের অনেকেই লিখতে চেষ্টা করেন এরকমই।
১৯৬৬ সালে উপন্যাসে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদ (বাংলা একাডেমী’র “চরিতাভিধান”-এ নামের বানান ‘কাজী আফসরউদ্দীন আহমদ’)। ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদের পুত্র জামাল আরসালান, কামাল আরসালান ও আলতামাস পাশা এবং কন্যা শাহানা আফরিন পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন লেখালেখির জগতে নিবেদিত থেকে। তাঁরা সবাই স্ব-স্ব বৈশিষ্ট্যের ছাপ রেখে চলেছেন সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়।
কৌতূহলী পাঠকদের জন্য এখানে উদ্ধৃত করছি কাজি আফসার উদ্‌দিন আহমদের “বাতাসী” উপন্যাসের অংশবিশেষ:
“বাতাসী আলুলায়িত।
“বিস্রস্ত বসন তার। উন্মাদ বাতাস এতোক্ষণ তাকে নিয়ে খেলেছে। সে ছিলো তন্দ্রায় আচ্ছন্ন। সে ছিলো ভাব-সমুদ্রে ডুবুরীর মতো। জাগ্রত চৈতন্যে তার ভর্‌ ছিলো না।
“এইমাত্র জয়নালের স্পর্শে সে সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে।
“মেঘের বর্ষণে ক্ষেতের ধানের শীস্‌ আনন্দে-উল্লাসে সপ্‌সপে। এবার তারাও জাগবে। - এমনি উল্লাস বাতাসীর চোখে।
“শরীরে আব্‌রু আছে কি নেই, সে দেখলো না তা।
“তার দৃষ্টি তার পুরুষের মুখের উপর বন্দি হয়ে গেলো।
“সে দেখ্‌লো জয়নালকে।...”

আকাশের দিকে হা

বড় হয়েছি নদীর সঙ্গে। আমাদের টাঙ্গাইল শহরের পশ্চিম পাশ ঘেঁষে ছিল সেই নদী। নাম লৌহজঙ্গ। বর্ষায় দু’ কূল ছাপিয়ে হয়ে উঠতো প্রবল প্রমত্ত। তখন কি তীব্র স্রোত! বহু দূর থেকে শোনা যেতো নদীর ডাক। তখন কত নৌকা যেতো পাল তুলে, গুণ টেনে। ছোট-বড় মহাজনী নৌকার ভিড় হতো ঘাটে-ঘাটে। নৌকা বাইচ হতো রীতিমতো হৈহল্লা করে, ঢাকঢোল পিটিয়ে। অন্য সময়ে কুলু-কুলু বয়ে যেতো লৌহজঙ্গ, শীতকালে তো রীতিমতো শান্তশিষ্ট।
শহরের বুক চিরেও ছিল একটি খাল। শ্যামবাবুর খাল। শহরের পশ্চিম উপকণ্ঠ দিয়ে বয়ে যাওয়া বংশাই নদীর সঙ্গে লৌহজঙ্গকে যুক্ত করার জন্য কাটা হয়েছিল সেই খাল। সে কাজ করেছিলেন শ্যামবাবু নামের কোনও ঠিকাদার। সেই থেকে খালের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর নাম। এ খালেও পানি থাকতো সারা বছর। বর্ষাকালে ভিড় হতো রাজ্যের ছৈওয়ালা নৌকার। শহরের মধ্যেও ছিল অসংখ্য ছোট-বড় খাল আর নালা। তাই আমাদের গত শতকের পঞ্চাশ দশকীয় জীবনের সঙ্গে ভেলা আর নৌকার সম্পর্ক ছিল গভীর। কাঁচা-পাকা পথে কত যে ছিল বাঁশের সাঁকো, কাঠের পুল, ইঁট সিমেন্ট লোহার সেতু, কালভার্ট, ব্রিজ। নদী পার হতে ছিল খেয়া, ফেরি।
 শহরের দক্ষিণ-পুব উপকণ্ঠে, নগর জলফৈ গ্রামের মরা পৌলি বিলের এক প্রান্তে, ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কে এক ব্রিজ নির্মাণ নিয়ে - আহা কত যে উত্তেজনা ছিল আমাদের! স্কুলের ছুটিছাটায় প্রায়ই ছুটে যেতাম সেখানে। ইঁটভাটা থেকে খুঁজে-খুঁজে নিয়ে আসতাম মধ্যিখানে ফুটো গোলাকার চাকা-ইঁট।  সেগুলো দিয়ে গাড়ি বানিয়ে ঘুরতাম পাড়াময়। দু’ পাশ থেকে খাড়া উঁচু হয়ে ওঠা সেই সঙ্কীর্ণ ব্রিজ নির্মাণের দুর্নীতি নিয়ে অনেক কেচ্ছাকাহিনী শুনেছি অনেক। সে ব্রিজে উঠতে নামতে অতিরিক্ত সাবধান হয়ে গাড়ি চালাতে হতো চালকদের, যাত্রীরাও কাঁপতেন থর-থর করে। তারপরও বহু দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি হয়েছে সেখানে।
বর্ষাকালে পানির প্রচণ্ড চাপ পড়ে সড়কের ওপর। তাই দু’ পাশে পানির চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে সেতুগুলি। কিন্তু নগর জলফৈ’র সেই সেতুটি অতিসঙ্কীর্ণ হওয়ায় পানির চাপ বরং বাড়িয়ে দিতো সড়কের ওপর। এতে সেতুর দু’পাশের মাটি ধসে যেতো, সড়কও ভাঙতো। পরে ওই সেতুর অনতিদূরে পর-পর দু’টি কালভার্ট করে কমাতে হয় পানির চাপ।
এখন অবশ্য কিছু নেই সে সব। এই দশ-বিশ বছরের মধ্যে উধাও হয়ে গেছে যাবতীয় খেয়া সাঁকো পুল সেতু ব্রিজ কালভার্ট। শ্যামবাবুর খালের চিহ্ন কেউ খুঁজে পাবেন না শহরের কোথাও। সেই লৌহজঙ্গ-ও নেই। এ সব সেতু-ব্রিজের জন্য কত আন্দোলন হয়েছে এক সময়। মনে আছে টাঙ্গাইলের প্রখ্যাত রাজনীতিক-সাহিত্যিক সৈয়দ আবদুল মতিন অনশন ধর্মঘট করেছিলেন লৌহজঙ্গের বুকে ব্রিজ নির্মাণের জন্য। তখন তিনি জানতেন না, একদিন কোনও জলধারা থাকবে না নদী নালা খাল বিল হাওর বাওড়ের কোথাও। সব কিছু বুজে যাবে চারপাশের বিস্তারে, সেতু সাঁকো পুল ব্রিজ কলভার্ট মাটিচাপা দিয়ে চলে যাবে সড়ক-মহাসড়ক।
কেবল আমাদের টাঙ্গাইলের কথা বলছি কেন, যত জেলা-উপজেলা শহরে যাই... দেখি প্রায় একই অবস্থা। তারপরও বাসে-ট্রেনে যেতে-আসতে মাঝেমধ্যে দেখি বিরান মাঠের বুকে - ধূ-ধূ শূন্য চরাচরের মধ্যে - আকাশের দিকে হা করে আছে কত ইট সিমেন্ট কনক্রিট ইসপাতের সংযোগ। দু’দিকে পাড় নেই কোনও, তবুও তারা আছে বন্ধন হয়ে। যানবাহন চলাচল করছে দিনরাত, আর তাদের নিচে শূন্য ভিটায় চরছে বালু ভরা ট্রাক, ভ্যান। এই ঢাকার কাছে কালিগঙ্গা সেতুর কথাই বলি। ৩৫ বছর আগেও দেখেছি ব্রিজের নিচে প্রমত্ত স্রোতধারা, এখন দেখি খাঁ-খাঁ বালুমহাল। যমুনা সেতু পার হতেও দেখি দু’ পাশে জেগে ওঠা চরভূূমিতে একটা-দু’টা ট্রাক। আজ পদ্মা সেতু নিয়ে এত কাণ্ড, কিন্তু দশক দুই পরে কি হবে তা-ই ভাবি!


sazzadqadir@gmail.com

শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

স্মাগলারদের পোষ্য যারা

ভারতের বাংলাদেশ-বিরোধিতাকে আমরা বলি ‘দাদাগিরি’, ভারতের সঙ্গে দেয়ানেয়ায় আমরা যখন দেশীয় বা জাতীয় স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলি তখন বলা হয় ‘ভারত-বিরোধিতা’। আসলে সব দেশ ও জাতিই দেখে নিজ-নিজ স্বার্থ। তাতে কিন' দোষ হয় না, কেবল দোষ ঘটে আমাদের বেলায়। অথচ দু’ দেশের স্মাগলার আর কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ ও মতলববাজ আমলার কারণেই শুধু মাঝেমধ্যে দেখা দেয় নানারকম টানাপড়েন। এমনিতে দু’ দেশের জনগণ ও রাজনীতিকদের প্রায় সকলেই অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন। অতি অল্প কিছু দুষ্ট সব দেশেই আছে, বাংলাদেশ ও ভারতেও আছে। তাদের দায় কেন নিতে হবে সবাইকে? বাংলাদেশে আইএসআই থাকলে র’ কি নেই? বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যত কথাই বলা হোক, এখানে বাবরি মসজিদ, গুজরাত বা আসামের পর্যায়ে বা মাত্রায় কোনও ঘটনা কখনও ঘটায় নি বাংলাদেশের মানুষ। আসলে ভারত-বিরোধিতা বলতে কিছু নেই বাংলাদেশে। ভারতের বিরুদ্ধে কি করবে বাংলাদেশ? যুদ্ধ না কচু? কিছু লোক ভারত-বিরোধী জিগির তোলে, ভারতীয় পণ্য পোড়ায় - খোঁজ নিলে জানা যাবে, ওরা দু’ দেশের স্মাগলারদের পুষ্যি। ভারতীয় শাড়ি, ড্রেস, প্রসাধনী ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম বাজারে কমতে শুরু করলেই মাঠে নামানো হয় তাদের। এজন্য দেখা যায় প্রতি বছর পুলিশ ও অন্যদের দিয়ে দোকানে-দোকানে তল্লাশি চালানো হয় ঈদের আগে-আগে। তাতে পুলিশের তোলা ওঠানোও হয়ে যায়, দামও প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো যায় এক লাফে।
    গত ৪০ বছরে সম্পর্কের নানা পর্যায় পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ও ভারত। এতগুলো বছর ধরে ক্রমান্বয়ে অনেক কিছু নিয়মিত হওয়ার পর কিছু-কিছু বিষয় মীমাংসার অপেক্ষায় রয়েছে এখনও। তবে দু’ দেশের বর্তমান সরকারের মধ্যে যে আন্তরিকতা দেখি তাতে সমাধান খুব দূরে নয় আশা করছি। সীমান্তে হত্যা, ছিটমহল হস্তান্তর, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন প্রভৃতি অল্প কয়েকটি বিষয় এখন রয়েছে কষাকষির পর্যায়ে। এ ছাড়া ভিসা ও সীমান্ত অতিক্রম পদ্ধতি সহজতর করা দু’ দেশের জন্যই মঙ্গল। চিকিৎসা, শিক্ষা, তীর্থ দর্শন, ভ্রমণ ও অন্যান্য কাজে অনেক বাংলাদেশী যান এবং আরও অনেক যেতে চান ভারতে। ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া এতেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে এবং আরও হতে পারে তাদের। আর হ্যাঁ, সীমান্তে ও অন্যান্য স'ানে এই বৈদেশিক মুদ্রাদাতারা ভাল ব্যবহার আশা করতেই পারেন। আসলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিস্ময় ঘটাবার জাদু একটাই - ভারতের উদার মনোভাব। পরস্পরের স্বার্থে এতটুকু ছাড় না দিয়েও এ মনোভাব বজায় রাখা যায়।
    বর্তমান সরকারের আমলে অনেক ক্ষেত্রেই যোগাযোগ বেড়েছে ভারতের সঙ্গে। ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশা করছি আমরা। ১৯৬৫ সালের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক যোগাযোগ রুট চালু হচ্ছে একে-একে। চলচ্চিত্রও আসছে। কলকাতার বাংলা ছবি এসেছে তিনটি। বলিউডের ন’টি হিন্দি ছবি আসছে শিগগিরই। কিন' আমদানিকারকরা ব্লকবাসটার ছবিগুলো আনতেই বেশি আগ্রহী। আমরা আশা করেছিলাম দর্শক ও সমালোচক উভয় মহলে প্রশংসিত ছবিগুলো এলে আমাদের এখানকার প্রেক্ষাগৃহযাত্রীর সংখ্যা বাড়তো, প্রেক্ষাগৃহগুলোরও পরিবেশ ও ব্যবস'া উন্নত হতো। কিন' সে আশায় দেখছি গুড়ে বালি!
    ভারতীয় পণ্য আসে বৈধ-অবৈধ নানা পথে। তারপরও সীমান্তে শুল্ক, কর, ঘুষ এবং পথে-পথে তোলা-চাঁদা সত্ত্বেও দেখা যায় বাজারে ভারতীয় পিয়াজ ২৫ টাকা হলে দেশী পিয়াজ ৩৫ টাকা। তবে সর্বত্র এমন নয়। অনেক ভারতীয় পণ্য কিনতে হয় দ্বিগুণ-ত্রিগুণ দামে। বিলাস-সামগ্রীর ক্ষেত্রে এটা সহ্য করতে পারেন বিলাসীরা, কিন' আমরা তো আর সে সব না হলেও চলে। আমাদের দরকার বই। ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, লেখক, বিচারক, আমলা, রাজনীতিক - সবার দরকার বই। সে বই-পত্র তো বিলাস-সামগ্রী নয়, তা কেন কিনতে হবে দ্বিগুণ-ত্রিগুণ দামে? এর কারণ নাকি সরকারের চাপানো নানা রকম ট্যাক্স-করের বোঝা। শিক্ষা-সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত পণ্যে এত বোঝা কাম্য নয় আমাদের। সমাজ-উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থে বিষয়টি কি ভেবে দেখবেন সংশ্লিষ্টরা?

sazzadqadir@gmail.com

আমার ব্যাংক ঋণ

ব্যাংক নিয়ে এত খবর আগে তোলপাড় করে নি সংবাদমাধ্যমকে। প্রথমে গ্রামীণ ব্যাংক, তারপর বিশ্ব ব্যাংক, আর এখন সোনালী ব্যাংক। তিনটি ক্ষেত্রেই সরকার বা সরকারের লোকজন অভিযুক্ত। এর আগে থেকেই অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল - সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে দেদার। এ কারণে গ্রাহকদের একটু বেশি অঙ্কের পাওনা টাকা দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ঘটনা সত্য। আমার পরিচিত একজনের বিপত্তির খবর জেনে বুঝলাম, কত সর্বনাশের কারণ হয়ে উঠেছে এসব আর্থিক কেলেঙ্কারি। সারা জীবনে তিনি আয়-উপার্জন যা করেছেন তা থেকে কিছুটা সঞ্চয় করেছেন ভবিষ্যতে ঘরবাড়ি নির্মাণের আশায়। ব্যাংকে রাখা সে সঞ্চয় এমন কিছু নয়। তারপরও নির্মাণকাজ শুরু করার পর টাকা তুলতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন প্রায়ই।
    এ তো নিজের জমানো টাকা। এ টাকা নিয়েই এত সমস্যা। কিন' সমস্যা নেই ঋণ পেতে। কিছু লোককে খুশ করলে যত খুশি ঋণ নেয়া যায়। অথচ আমার ধারণা ছিল খুব জটিল কঠিন বিষয় এই ঋণ পাওয়াটা। বছর আটেক আগে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ পেতে ব্যাংকে-ব্যাংকে ছুটোছুটি করেছি খুব। কাগজপত্র ঘেঁটে, কথা বলে জেনেছি - ৫০% থেকে ৭০% পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায়, তবে সুদের হার নানা রকম। তারপর ব্যাংক যখন প্রয়োজন মনে করবে তখন তাদের ইচ্ছামাফিক বাড়িয়ে নেবে সুদের হার। এছাড়া বয়সেরও ব্যাপার আছে একটা। চুক্তি দুই পক্ষের মধ্যে হলেও সকল শর্ত থাকবে ব্যাংকের পক্ষে। গ্রহীতার পক্ষে কিছু নেই।
    অনেক মাথা ঘামিয়ে, সুদের হার কিছু কম, এমন এক ব্যাংককে বেছে নিই আবেদন করার জন্য। সেখানকার ঋণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একজন পদস' কর্মকর্তার সঙ্গে যাই দেখা করতে। এক সময় সাংবাদিক ছিলেন তিনি, এজন্য আশান্বিত ছিলাম বিশেষভাবে। কিন' আমার সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই তিনি বলেন, আমিও সাংবাদিক ছিলাম। কিন' সে পরিচয় আর দিই না এখন। বহু সাংবাদিককে বাড়ি করার জন্য ঋণ দিয়েছি আমরা। কিন' নিয়মিত দূরে থাক কোনও কিস্তিই দেন না তাঁদের অনেকে। চিঠি দিলে রাগারাগি করেন, তেড়ে আসেন, হুমকিও দেন।
    বিড়ম্বনার আরও অনেক কাহিনী শোনান তিনি। শেষে বলেন, ‘সাংবাদিকদের ঋণ আমরা দেবো না - এটা আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত।’ ওই কর্মকর্তা এখন ওই ব্যাংকের ব্যবস'াপনা পরিচালক।
    এভাবে ব্যাংক ঋণ পেতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হই আমি। সুদীর্ঘ ৪০ বছর (এখন ৫০ বছর) লেখক-সাংবাদিক হিসেবে শতভাগ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে ওই জোটে আমার যাবতীয় অযোগ্যতার পুরস্কার। এরপর ঋণ পেতে ব্যাংকে ছুটোছুটি করেন আমার স্ত্রী ও তাঁর পক্ষের আত্মীয়-স্বজন। সেখানকার কর্মকর্তারা রাশি-রাশি কাগজপত্র দাবি করতে থাকেন আর সেগুলো যোগাড় করতে-করতে প্রায় আধখানা হয়ে যান মহিলা। তারপরও শেষ হয় না এ দাবি, ও দাবি। শেষে সরজমিন তদন্তে আসেন এক কর্মকর্তা। কথায়-কথায় তিনি জানান, তাঁর মা আমার ছাত্রী। পরিচয় দিতেই মনে পড়ে যায় আমার সেই ১৯৭২-৭৬ সালের অধ্যাপনা-জীবনে ক্লাশে ও টিউটোরিয়ালে দেখা তরুণীটিকে। মেধাবী ছাত্রী হিসেবে আমার প্রিয় ছিল সে, আমার প্রতিও ছিল তার অনেক শ্রদ্ধা-সম্মান। সেই ছাত্রীর সন্তান? খুব খুশি হই এই আশায় যে, এবার সব ফ্যাকড়া শেষ। কারণ তাঁর রিপোর্টের ভিত্তিতেই মঞ্জুর হবে ঋণ।
    তা অবশ্য হয় নি শেষে। তিনি এমন রিপোর্ট দেন যে তাতে অসম্ভব হয়ে ওঠে আমার ঋণ পাওয়া।


sazzadqadir@rediffmail.com

বাংলা কবিতা দিবস ১লা আশ্বিন

প্রতি বছরের মতো এবারও ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা শহরে বাংলা কবিতা দিবস পালিত হচ্ছে রোববার ১লা আশ্বিন ১৬ই সেপ্টেম্বর। তবে কোথাও-কোথাও দিবসটি ১৪ ও ১৫ই সেপ্টেম্বরও পালিত হয়েছে। গত শুক্রবার বাংলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ও পাক্ষিক বৈচিত্র-এর যৌথ উদযোগে বাংলা কবিতা দিবস পালিত হয় ১৫ নিউ বেইলি রোডের দ্বিতীয় ভবনের চতুর্থ তলায়। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ, আলোচনা-আড্ডায় যোগ দেন কবি সাযযাদ কাদির, শাহীন রেজা, ফেরদৌস সালাম, রোকেয়া ইউসুফ, তাহমিনা কোরাইশী, শামসুনাহার, হোসাইন রিদওয়ান আলী খান, নূর কামরুননাহার, মেহের নিগার, কাফি কামাল, সালমান ফরিদ, শাহানা জেসমিন, কামরুজ্জামান, সাবিত সারোয়ার, জামিল জাহাঙ্গীর, কাজী ফারহানা ইয়াসমিন শান্তা, সেঁজুতি শুভ আহমেদ, তকিউদ্দিন মোহাম্মদ আকরাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানের শুরুতে সদ্যপ্রয়াত কবি আপন মাহমুদ স্মরণে শোক নিবেদন করা হয়।

বৃহস্পতিবার, ৩০ আগস্ট, ২০১২

উদ্ভট পেঁচার ব্যঙ্গ

আলোকিত মানুষ গড়ে তোলার আন্দোলনের জন্য দেশে-দেশে নন্দিত  এক নাম - আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। শিক্ষক হিসেবেও সকল মহলে একই রকম বন্দিত তিনি। তাঁর নামের আগে তাই ‘অধ্যাপক’ লেখা হয় যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে । তবে আমার মতো অনেকের কাছে  তিনি বিশেষভাবে পরিচিত কবি, কথাসহিত্যিক, সম্পাদক হিসেবে। অনুবাদ, নাটক প্রভৃতিতেও এক সময় প্রবল উৎসাহ দেখেছি তাঁর। শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চা ছাড়াও টিভি ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর যে সর্বজনমান্য অবস্থান তা তো এখনই পেয়েছে কিংবদন্তির মর্যাদা। তাঁর পরিচয় আমি প্রথম পাই ষাটের দশকের প্রথম দিকে, ওই সময়ের আলোচিত কবিতাপত্র ‘স্বাক্ষর’-এ প্রকাশিত একটি কবিতার সূত্রে। কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন এক জ্ঞানপাপী সম্পর্কে। সে শেঙপিয়ার, মিলটন, ইউরোপের সাহিত্য, দর্শন, রেনেসাঁ সম্পর্কে পড়েছে... কিন্তু সে সব পড়া একটুও আলোকিত করতে পারে নি তাকে, কাজে-কর্মে চিন্তাচেতনায় সে থেকে গেছে চরম কুক্রিয়াশীল। যদ্দূর মনে পড়ে কবিতাটির শুরু ‘লোকটি শেঙপিয়ার পড়েছিল...’ আর শেষ ‘এক উদ্ভট পেঁচা ব্যঙ্গ করে গেছে তাকে’। তখন ধারণা করেছিলাম, পরে শুনেছিও, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কবিতাটি লিখেছিলেন ওই সময়কার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনকে লক্ষ্য করে। তিনি পণ্ডিত ছিলেন, একই সঙ্গে ছিলেন প্রতিক্রিয়ার প্রতিমূর্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠার প্রতিভূ, জাতীয়তাবোধ ও বাংলা-বাঙালি চেতনার বৈরী। বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়ুবি-মোনেমি ভাবাদর্শ ও পরিকল্পনার ধারক, বাহক ও বাস্তবায়ক। আমার নামের বানান পরিবর্তনের অন্যতম কারণ তিনি। অথচ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন (১৯২০-১৯৯৫)-এর একাডেমিক কৃতিত্ব ছিল অনেক। ১৯৪২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজিতে এম এ পাশ করেন প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে। ১৯৫২ সালে ইংল্যান্ডের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি পান ইংরেজ কবি-কথাসাহিত্যিক জোসেফ রাডিয়ার্ড কিপলিং (১৮৬৫-১৯৩৬)-এর সাহিত্য ও তাঁর রচনায় প্রকাশিত ভারতীয় উপমহাদেশের জীবনধারা সম্পর্কে গবেষণা করে। ইংল্যান্ডের কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপমহাদেশের কোন মুসলমান গবেষকের সেই প্রথম পিএইচডি অর্জন।
    মনে পড়ে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অনেকেই ছিলেন আমাদের সমালোচনার প্রধান লক্ষ্য। ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ছাড়াও ইতিহাস বিভাগের ড. মুহম্মদ মোহর আলী (১৯৩২-২০০৭), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ড. হাসান জামান প্রমুখের কার্যকলাপের সমালোচনায় মুখর থাকতো আমাদের আড্ডাগুলো। মোহর আলীর পাণ্ডিত্য ছিল সুবিদিত। বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস বিষয়ে তিনি ছিলেন বিশারদ। ১৯৬৩ সালে পিএইচডি করেছেন ইউনিভারসিটি অভ লন্ডনের স্কুল অভ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে। পরের বছর আইন পড়েছেন লিঙ্কনস্‌ ইন-এ। মধুর ক্যানটিন, শরিফ মিঞার ক্যানটিন, টিএসসি’র লন বা ক্যানটিন, নিউ মার্কেটের মোনিকো, বাংলাবাজারের বিউটি বোর্ডিং, নবাবপুরের ঢাকা হোটেল, গুলিস্তানের রেঙ - যেখানেই আড্ডা ছিল আমাদের ঘুরেফিরে আসতো তাঁদের ক’জনের নাম। তখন স্বায়ত্তশাসনের দাবি পরিণত হচ্ছে স্বাধিকারের আন্দোলনে, তারপর তা রূপ নেয় স্বাধীনতার সংগ্রামে।
    মনে পড়ে সেই আড্ডার মুখগুলোকে। মুখে-মুখে তখন সুকান্ত, সুভাষ, নজরুল, জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ। উৎপল দত্ত, সলিল চৌধুরী, মুলকরাজ আনন্দ, রাহুল সাংকৃত্যায়ন। খাজা আহমদ আব্বাস, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, নাজিম হিকমেত। পুশকিন, গোগোল, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, চেখভ, গোর্কি, শলোকভ। লু সুন, কুয়ো মোরো, লাও শে, মাও তুন, পা চিন। হাতে-হাতে অধ্যাপক নীহারকুমার সরকারের ‘ছোটদের অর্থনীতি’, ‘ছোটদের রাজনীতি’; ড. দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘যে গল্পের শেষ নেই’, ‘নিষিদ্ধ কথা আর নিষিদ্ধ দেশ’, ‘লোকায়ত দর্শন’; নরহরি কবিরাজের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙ্গালী’; রেবতীমোহন বর্মণের ‘ভারতের কৃষকের সংগ্রাম ও আন্দোলন’, ‘সমাজ সভ্যতার ক্রমবিকাশ’; রণেশ দাশগুপ্তের ‘উপন্যাসের শিল্পরূপ’; শহীদুল্লা কায়সারের ‘রাজবন্দীর রোজনামচা’; শহীদ সাবেরের ‘এক টুকরো মেঘ’; সত্যেন সেনের ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’; ‘সোভিয়েত লিটারেচার’; ‘চাইনিজ লিটারেচার’; লিউ শাওছি’র ‘ভাল কমিউনিস্ট হওয়ার উপায়’; হো চি মিন-এর ‘কারাগার কাব্য’; ফ্রানৎস ফানোন-এর ‘দ্য রেচেড অভ দ্য আর্থ’; ক্রিসটোফার কডওয়েল-এর ‘ইলিউশন অ্যান্ড রিয়ালিটি’, জন রিড- এর 'দুনিয়া কাঁপানো ১০ দিন ' ... আরও কত বই। আর কত তর্ক মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, ট্রটস্কি, মাও, মানবেন্দ্রনাথ... কত জনকে নিয়ে।
    আড্ডার কেউ থেকে গেলাম সাহিত্যে। কেউ গেলেন রাজনীতিতে। হারিয়ে গেলেন অনেকে। আবার অনেকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছেন শীর্ষ বলয়ে। দিনের পর দিন যাঁদের সঙ্গে আড্ডা জমিয়েছি, তর্ক করেছি, হাসি-আনন্দে মেতেছি তাদের অনেককেই হতে দেখেছি ও দেখছি মন্ত্রী-এমপি, জবরদস্ত আমলা এবং জব্বর ধনী ব্যবসায়ী। দেখছি তাদের নেতা-নেত্রী এখন কারা,  আর তারা কাজকর্ম কি করছেন! উদ্ভট পেঁচা ব্যঙ্গ করে গেছে তাদেরও!

sazzadqadir@gmail.com

গাব খেতে চায় কাক

আসলে নির্বাচন এক অনিঃশেষ প্রক্রিয়া। এক নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে শুরু হয় পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি। কৌশলের পর কৌশল নির্ধারণ। টারগেটের পর টারগেট ঠিকঠাক। আয়োজন। যোগাড়যন্ত্র। এ সবের এক পর্যায় শেষ হয়েছে গত সাড়ে তিন বছরে। এখন শুরু হয়েছে দ্বিতীয় পর্যায়ের মহড়া। সামনেই ফাইনাল খেলা। আর গাব খেতে চায় একাধিক কাক। তবে এর মধ্যেই এক কাকের গলায় ঠেকেছে গাবের বিচি। খেতে মজা, কিন্তু গলা দিয়ে গলছে না ঠিকমতো। তাই কাক বলছে, গাব খাবো না - গাব খাবো না! অন্য কাক ভাবছে খাওয়ার মজাটাই আসল। তাই বলছে, গাব খাবো না খাবো কি? গাবের মতো আছে কি? প্রিয় পাঠক, আপনারা ঠিকই অনুমান করেছেন ... আমাদের নির্বাচনী কাকের গলায় ঠেকেছে তদারক সরকার নামের বিচি। এক দলের আশঙ্কা নির্বাচনে চিৎপটাং হওয়ার। অন্য দলের আশা সোনার হরিণ ফিরে পাওয়ার। দুই দলই ক্ষমতা চায়, ক্ষমতায় স্থায়ী হতে চায়। মরীচিকার সামনে মরুতৃষ্ণায় কাতর তারা। জানে না কি ফল এনে দেবে নির্বাচন, তবুও আশঙ্কা ও সম্ভাবনায় দুলছে দু’টি দল। কারণ একটাই। উভয়েই জানেন সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিন (১৮৭৮-১৯৫৩)-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি - “The people who cast the votes don't decide an election, the people who count the votes do.” অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন এবং তাদের সহায়তাকারীরাই আসল ক্ষমতার উৎস! তদারক সরকারের মাধ্যমে ওই উৎস নিয়ন্ত্রণ করা যায় - এমন ধারণা থেকে চলছে দুই দলে চরম টানাপড়েন। কষাকষি। আমাদের টাঙ্গাইলের ভাষায় বলি ‘কষ্টাকষ্টি’!
    এ অবস্থায় এখন চলছে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পরিস্থিতি। আওয়ামী লীগ বলছে, অতীতে তদারক সরকারের অভিজ্ঞতা ভাল নয়। কাজেই ওটা বাদ। নির্বাচন হবে দলীয় সরকারের অধীনে। বিএনপি বলছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তিক্ত। তাই নির্বাচন হতে হবে তদারক সরকারের অধীনে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, কেউ ছাড় দিতে রাজি নয় কাউকে। আওয়ামী লীগের আশঙ্কা, নির্বাচনে হেরে গেলে তাদের শিকার হতে হবে ভয়াবহ প্রতিহিংসার রাজনীতির। বিএনপি’র আশঙ্কা, যে ভয়ানক প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার তারা... তাতে নির্বাচনে না জিতলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হবে তাদের। এ অবস্থায় তদারক সরকার ব্যবস্থা ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। তখন খালি মাঠে গোল দেয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হবে আওয়ামী লীগকে। অমন পরিস্থিতি অভিপ্রেত নয় তার। তাই দরকার একটি মর্যাদাসম্পন্ন বিরোধী দলের - যা বিকল্প হতে পারে বিএনপি’র। আওয়ামী লীগের পছন্দ এখানে জাতীয় পার্টি। আশা করা হচ্ছে এই পার্টিই হবে “হার ম্যাজেস্টি’স লয়্যাল অপোজিশন”। এ জন্যই নানা ভাবে চুনকাম করে, সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরি করা হচ্ছে তাকে। তাদের সাম্প্রতিক দিল্লি পলিশ-ও ওই মর্যাদায় এক মেক-আপ, একই সঙ্গে গেট-আপ।
    তবে হিসাবে গড়বড় হতে কতক্ষণ! গত সাড়ে তিন বছরের স্থানীয় নির্বাচনের হাল হকিকত দেখলে সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত সঙ্গী জুটে যাওয়ার আশঙ্কাই জাগে। ময়দানে বিএনপি না থাকলে দৌড়ে জাতীয় পার্টিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে জামায়াত ইসলামী-ই। সেই খরগোশ ও কুকুরের গল্প মনে থাকতে পারে সবার। খাবারের জন্য দৌড় আর প্রাণ বাঁচাতে ছুট এক হয় না কখনও। তেমনই ঘটতে পারে ওই নির্বাচনী দৌড়ে। আর এমনিতে নির্বাচন আর কি? মারকিন সমালোচক এইচ এল মেনকেন (১৮৮০-১৯৫৬) যে লিখেছেন “Every election is a sort of advance auction sale of stolen goods” - তা তো মিথ্যা নয় একেবারে?

sazzadqadir@gmail.com

বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট, ২০১২

তৃতীয় শক্তির খোঁজখবর

তৃতীয় শক্তির কথা প্রথম শুনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮)-র এক বক্তৃতা প্রসঙ্গে। ১৯৪০ সালে দেয়া সেই বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, “There are two powers in the world; one is the sword and the other is the pen. There is a great competition and rivalry between the two. There is a third power stronger than both, that of the women.”  (‘পৃথিবীতে দুই শক্তি; একটি তলোয়ারের, অন্যটি কলমের। দু’টিতে তীব্র প্রতিযোগিতা ও রেষারেষি। তবে ওই দু’টির চেয়েও জোরালো শক্তি আছে, সে শক্তি নারীর।’) তৃতীয় শক্তির কথা এরপর শুনি একাত্তরের ২৫শে মার্চে এ দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা অভিযান শুরু হওয়ার পর বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে। সেখানে নিবন্ধকার মন্তব্য করেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলি ভুট্টো দু’জনেই ভুলে গিয়েছিলেন - দেশে তাঁরা ছাড়াও একটি তৃতীয় শক্তি আছে। সে শক্তি সামরিক বাহিনী।’ এরপর তৃতীয় শক্তির কথা শুনি ১৯৮৩ সালে, শিশু একাডেমীতে আয়োজিত এনজিও-সম্মেলনে এক বক্তার বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে এনজিগুলো-ই তৃতীয় শক্তি। আগামীতে আমরাই বসবো রাষ্ট্রক্ষমতায়।’ প্রথম দুই শক্তি বলতে তিনি বুঝিয়েছিলেন রাজনৈতিক দল ও সামরিক বাহিনীকে। তারপর থেকে তৃতীয় শক্তির কথা নানা ভাবে শুনছি নানা মহলের কাছ থেকে। সমাজতন্ত্র, জনগণতন্ত্র, শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমাজ, মার্কস এঙ্গেলস লেনিন স্তালিন মাও হোজা তিতো চে কাসত্রো শাভেজ প্রমুখের কথা বলে - এমন ছোট-ছোট দলগুলো তৃতীয় শক্তি হতে চায় জোট বেঁধে। অন্যদিকে ইসলাম-নির্দেশিত রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করে পুণ্যপবিত্র সমাজ-জীবন প্রতিষ্ঠায় উৎসাহী ছোট-ছোট দলগুলো নিজেদের তৃতীয় শক্তিই ভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শর্তে। দু’টি জোটই সামনে দেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে। তাঁরা ভাবেন, ‘আমরা যেদিকে যাবো সেদিকেই জয়, আমাদের ছাড়া কারও জয় নয়’। তাঁদের ওই চিন্তার প্রভাব ওই দুই দলের ওপর আছে। তাই দুই দলই জোটে বদ্ধ করতে চায় তাদের। সাধ্যমতো করেছেও। তবে এর বাইরেও আছে আরও দল-বল। দুই দলের দলছুটেরা মাঝে-মধ্যে ঐক্যপ্রয়াসী হয়, এক মঞ্চে ওঠে। জোট গড়তে চায়, মোর্চা বানাতে চায়। গত তদারক সরকারের সময় কিছু তৎপরতা চোখে পড়েছে তাদের। আবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরেও একটি শক্তি উঠতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়েছে ওই সময়। এজন্যই তর্ক হয় - তৃতীয় শক্তি বলে কখনও কোনও কিছুর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে কিনা। অবশ্য এবার আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে এ শক্তির কথা প্রচার হচ্ছে জোরেশোরে, বেশি-বেশি করে।
এ শক্তি নতুন কিছু নয়। নানা দেশে এ নামে আছে নানা শক্তি। আয়ারল্যান্ডে আধাসামরিক বাহিনী পরিচিত তৃতীয় শক্তি হিসেবে। ফ্রান্সে চতুর্থ প্রজাতন্ত্রের সময় গড়ে ওঠা এক জোট পরিচিতি পেয়েছিল তৃতীয় শক্তি নামে। মিয়ানমারে ২০১০ সালের নির্বাচনে সেনা ও সুচি বিরোধী দলগুলোর জোট অভিহিত হয়েছে ওই নামে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসন অবসানের শেষ দিকে পরিবর্তন-বিরোধী এক জঙ্গি গোষ্ঠী মেতেছিল নৃশংস নাশকতায়। তাদের বলা হতো তৃতীয় শক্তি।
তবে আমাদের এখানে তৃতীয় কেন, প্রথম বা দ্বিতীয় শক্তিও নেই। এখানে শক্তি একটাই - জনশক্তি। এ শক্তি কথিত সকল শক্তিকেই গদিতে উঠিয়েছে, আবার হিড়-হিড় করে নামিয়েও দিয়েছে! সকল দম্ভীর দর্পই চূর্ণ করেছে এ শক্তি, ভবিষ্যতেও করবে।

sazzadqadir@gmail.com

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুলাই, ২০১২

একালের রূপকথা

এক যে আছে হোমরা ও চোমরা। লেখাপড়া, চাকরি ও ব্যবসা - কোনওটাতে সুবিধা করতে না পেরে তারা পার্টি করে খায় এখন। নেতার নামে চালায় সমিতি-সংগঠন। খায় চাঁদা-তোলা তুলে। নাম কা ওয়াস্তে অনুষ্ঠান-কর্মসূচিও করে হুমকি দিয়ে অন্যদের ঘাড় মটকে। সেখানে খরচপাতি করে নামমাত্র, বাকি পুরোটাই গোঁজে ট্যাঁকে। ইলেকশন জনসভা সংবর্ধনা ইত্যাদি থাকলে ওই গোঁজার পরিমাণ বাড়ে অনেক। এ সব করে-করেই গাড়ি বাড়ি নারী সব হয় হোমরা ও চোমরা’র। সমাজ-সম্মানও হয়। আতি থেকে পাঁতি, তারপর নেতাই হয়ে ওঠে।
তাদের এ পর্যন্ত সব ওঠাই কিন্তু পাবলিকের টাকা মেরে। কাজেই ওই মারার অভ্যাস আর যায় না কিছুতে। বাকি জীবন কাটে পরেরটা খেয়ে ও মেরে। নেতা হয়ে সময়-সুযোগ পেয়ে ওই মেরে-মেরেই নমিনেশন কেনে তারা, ইলেকশন করে, জেতে, এমপি-মন্ত্রী হয়। এজন্য ট্যাঁক থেকে খসাতে হয় না কিছু, বরং এ সবই হয়ে ওঠে বড়-বড় দানে ট্যাঁকে গোঁজার উপায়। সরকারে পদ পাওয়ার পর আয়-উপার্জন আরও বাড়ে হোমরা ও চোমরা’র। সেখানে খরচ নেই, সব কিছু সরকারের। সরকারের মাল মানে তো দরিয়া মে ডাল! কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্রের অর্থ তে জনগণের অর্থ। সরকারের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী জনগণের অর্থে শিক্ষালাভ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন জনগণের অর্থে। ওই অর্থ নির্বিশেষে সকল দেশবাসীর, কোনও বিশেষ দলের নয়। এই অর্থে কোনও দলাদলি না করারই কথা, কিন্তু কাজের চেয়ে দলাদলিই  বেশি করেন তাঁদের অনেকে। এই তাঁদেরই কাজে লাগিয়ে, ব্যবহার করে আঙুল ফুলে কলাগাছ থেকে বটগাছ হয় হোমরা ও চোমরা। কোনও খরচ নেই, কেবলই আয় আর আয়। বিত্ত আর সম্পদ। ধন আর ঐশ্বর্য।
কাজ কি হোমরা ও চোমরা’র? আমলা খাটিয়ে খাওয়া। আলিশান বাড়িতে থাকা। লেটেস্ট মডেলের ঝাঁ চকচকে গাড়ি হাঁকানো। সপরিবারে দলে-বলে বিদেশে-বিদেশে ঘোরা। ফাইভ স্টার। শপিং। হাই-ফাই। ছেলেপুলে পড়ানো ইউরোপ-আমেরিকার নামী-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। দেশে বাড়ছে জনসংখ্যা, পণ্যমূল্য, গ্যাস পানি বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কোন্দল-হানাহানি, মাদকাসক্তি, রোগ-ব্যাধি, দারিদ্র্য, শ্রমিক অসন্তোষ, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, দুর্নীতি, কুশাসন, জাল-ভেজাল, চোরাকারবার, অনিয়ম, অব্যবস্থা, অনুন্নয়ন। তাতে হোমরা-চোমরার কি? তারা বিবৃতি বক্তৃতা ভাষণ দিয়ে যাচ্ছে গলা ফাটিয়ে। সাজগোজ করে যাচ্ছে সভা, সেমিনার, টিভি-বেতারে দেশ জাতি জনগণের জন্য জানপাত করে যাচ্ছে দিন-রাত।
আসলে কি তাই? জনগণের কাছ থেকে নেয়া ছাড়া জনগণকে কখনও কিছু দেয় কি হোমরা-চোমরা? নিজেরা কি কিছু করতে পারে তারা? নিজেদের প্রচারের জন্য সরকারের বা অন্যের পত্রিকা বা বেতার-টিভি তাদের ভরসা, নিজেদের কিছু নেই ও সব। থাকলেও পাতে নেয়া যায় না সেগুলো। হোমরা-চোমরাকে বলি, পরোপকারের নামে আর কত নিজের উপকার করবে? সত্যি-সত্যি কিছু করো পরের জন্য। নাহয় একটা ছোটখাটো রাস্তাই করো। সেতু না পারো অন্তত একটা কালভার্ট করো। লোকজনের জন্য খাবার পানির ব্যবস্থা করো বিভিন্ন ভিড়ের স্থানে। শহরে-শহরে পাবলিক টয়লেট করে দিয়ে নারী শিশু বৃদ্ধদের কষ্ট দূর করো। নোংরা জঞ্জাল আবর্জনা সরাবার ও রিসাইক্লিং করার ব্যবস্থা করলে উপকার হয়, আয়ও হয়। মানে কিছু একটা করো। সামান্য হলেও করো। দেখিয়ে দাও নিজের অর্থে নিজেরা কিছু করতে পারো। হোমরা-চোমরা বলে, ঠিক বলেছো ভাই। এটা আমাদের মনের কথা। এটা আমরাও চাই। কিন্তু কিভাবে হাত উপুড় করতে হয় তা আগে শিখিয়ে দাও আমাদের। বলেই কেমন আমতা-আমতা করে হোমরা-চোমরা, মনে হয় শিখলেও হবে না। আমাদের হাতেই তো উপুড় করার সিসটেম নাই! অপারেশন ছাড়া হাত উপুড় হবে না!
sazzadqadir@rediffmail.com