সোমবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১২

সংবাদশিল্পের সন্ধানে

সংবাদ আমাদের সবসময়ের সঙ্গী। আমরা নিঃশ্বাস নেই সংবাদে, আমরা বাঁচিও সংবাদে। আমাদের জীবন-সংসার চলন বলন ভাবনা সবই সংবাদময়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত অসংখ্য সংবাদে ডুবে থাকি আমরা সবাই। আমাদের আবেগ আগ্রহ আকাঙক্ষা সবই সংবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের সকলের দেখা শোনা চেনা জানা, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যা কিছু সবই সংবাদবিজড়িত। যখন কথা বলি বা শুনি - সামনাসামনি বা সেলফোন-টেলিফোনে তখনও আদানপ্রদান করি সংবাদের। তারপর আছে কত শত সংবাদমাধ্যম। রেডিও, টেলিভিশন, ইনটারনেট, সেলফোন, সংবাদপত্র। বাংলাদেশী শ্রোতাদের জন্য সংবাদবিশ্ব উন্মুক্ত হয়ে গেছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রসারের সঙ্গে-সঙ্গে। রেডিওতে, এফএম ব্যান্ডে সারা দিনই খবর দেশী-বিদেশী নানা চ্যানেল থেকে। টেলিভিশনেও দেশী-বিদেশী অসংখ্য চ্যানেলে ঘণ্টায়-ঘণ্টায় পরিবেশিত হয় সংবাদ। আর আছে আমাদের দুই শতাব্দী প্রাচীন বিশ্বস্ত সঙ্গী সংবাদপত্র। অডিও-ভিসুয়াল মাধ্যমগুলোর বৈপ্লবিক উৎকর্ষে অনেকেই আশঙ্কা করেছেন, এর আকর্ষণ বুঝি যায়-যায়। কিন্তু সে সব আশঙ্কা অমূলকই প্রমাণিত হয়েছে। সংবাদপত্র স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে আছে এখনও। তাই আমরা সংবাদপত্রের চোখ দিয়ে দেখি, তার কান দিয়ে শুনি, তার বিবরণ থেকে বুঝি, এমনকি কথা বলি ও লিখি তার ভাষায়ই। সংবাদপত্রের আকর্ষণ কতখানি তা একটু মজা করেই লিখেছেন প্রখ্যাত মারকিন সাংবাদিক-সাহিত্যিক হেলেন রাওল্যান্ড (১৮৭৫-১৯৫০) -“Before marriage, a man declares that he would lay down his life to serve you; after marriage, he won’t even lay down his newspaper to talk to you.”
এমন তীব্র আকর্ষণের কারণ সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্য প্রভৃতির মতো সংবাদও এক শিল্প। সাহিত্যে যেমন ভাব ভাষা নির্মাণ, সংবাদেও তেমন তথ্য ভাষা উপস্থাপন। এ তিনটি ক্ষেত্রে যিনি যত শিল্পিত তিনি তত কৃতী সাহিত্যিক বা সাংবাদিক। সমস্যা একটিই। সেটা বলেছেন বৃটিশ কবি-সমালোচক ম্যাথু আরনল্ড (১৮২২-১৮৮৮) -“Journalism is literature in a hurry.” এই চটজলদি কাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সংবাদশিল্প নির্মাণ সহজ নয় কোনও সাংবাদিকেরই পক্ষে। তবে ওই মোকাবেলাটাও এক শিল্প। সে পথে দুই শতকে অনেকখানি পথ হেঁটে এসেছে সংবাদপত্র। তবে আরও পথ হাঁটতে হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এখন সে হাঁটা-চলা কেমন তা একটু সন্ধান করা যেতে পারে।
গত ২১শে এপ্রিল একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দিলে চালক পুড়ে মারা যান - এ খবরটি পরদিনের এক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে এভাবে:
“আট বাসে আগুন / চালক জীবন্ত দগ্ধ... বিএনপির সকাল-সন্ধ্যা হরতালের আগের দিন দুর্বৃত্তরা  রাজধানীর খিলগাঁও, গুলিস্তান, আবদুল্লাহপুর, আজিমপুর, ভিক্টোরিয়া পার্ক, মিরপুর ও ফার্মগেট এলাকায় ৮টি বাস আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। এ ঘটনাগুলোর মধ্যে খিলগাঁও খিদমাহ হাসপাতালের সামনে বদর আলী বেগ (৪০) নামের এক চালক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। নিহত বদর আলী ঈগল পরিবহনের একটি বাসের চালক ছিলেন। এছাড়া এসব ঘটনায় ৪জন আহত হয়েছেন। তবে বাসগুলোতে কারা কীভাবে আগুন দিয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে তা জানাতে পারে নি পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। বাস ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালানোর অভিযোগে ৮জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া হরতালের সমর্থনে গতকাল বিকালে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় মিছিল বের করেছে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এদিকে বিভিন্নস্থানে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রায় যানবাহনশূন্য হয়ে পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাড়ি ফেরা সাধারণ মানুষ। উল্লেখ্য, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীকে ‘গুম’ করেছে - এমন অভিযোগে বিএনপি রবিবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে।...”
    অন্য এক পত্রিকায় উপস্থাপনা এ রকম:
    “রাজধানীতে ৬ যানবাহনে আগুন / ১ জন নিহত... গতকাল শনিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর ছয়টি স্থানে ছয়টি বাস-মাইক্রোবাসে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়ার ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম বদর আলী (৪০)। তিনি বাসচালক। গতকাল দুপুর ২টার দিকে খিলগাঁও, আজিমপুর, গুলিস্তান ও উত্তরার আবদুল্লাহপুরে চারটি বাসে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ফকিরাপুলে আগুন দেয়া হয় সরকারি জনপ্রশাসনের এক মাইক্রোবাসে। এর আগে দুপুরে খিলগাঁওয়ে ঈগল পরিবহণের বাসে দেয়া আগুনে বাসটির চালক বদর আলী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান এবং হেলপার মোতালেব আহত হন। ঈগলের বাসটি (যশোর-ব-১১-০০১৯) ঢাকা-খুলনা রুটের। খিদমা হাসপাতালের সামনে ওই বাসটিকে আগুন ধরিয়ে দেয় কয়েকজন যুবক। এ গাড়ির ভেতর থেকেই উদ্ধার করা হয় গাড়িচালক বদরের মৃতদেহ।...”
    অন্য আরেক পত্রিকায় খবরটি এসেছে এভাবে:
    “বাসে আগুন, দগ্ধ হয়ে চালক নিহত... রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় গতকাল দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত আটটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে একটি বাসের চালক নিহত হয়েছেন। দুপুর থেকে একের পর এক বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর রাজধানীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হতে শুরু করে। বিশেষ করে রাস্তায় দুপুরের পর থেকে যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যা কমে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় অফিস ফেরত নগরবাসীকে। গতকাল দুপুরের পর থেকে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়িও কম দেখা গেছে। দুপুরে ।াধ ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি বাসে দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করে। এর মধ্যে খিলগাঁও গভর্নমেন্ট কলোনির সামনে পার্কিং করা বাসে আগুন লাগিয়ে দেয়ায় চালক বদর উদ্দিন (৪০) অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ওই বাসের চালকের সহকারী আবদুল মোতালেব। কে বা কারা কি কারণে বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে, তা নিশ্চিত জানা যায় নি। তবে পুলিশ দাবি করছে, বিএনপি’র ডাকা হরতালকে কেন্দ্র করেই বাসে আগুন লাগিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।...”
    ইংরেজি একটি পত্রিকায় খবরটি এ রকম:
   Bus was parked, driver asleep... A driver was burned to death and his assistant suffered injuries as their bus was set alight at the capital’s Khilgaon yesterday on the eve of the opposition-called hartal. Nine more buses, including three with passengers, were torched at Mirpur-1 and 10, Baridhara, Azimpur, Abdullahpur Beribadh, Gulistan, Darus Salam, Farmgate and near Bahadur Shah Park, fire brigade officials said. The latest was around 8:15pm. Police identified the ill-fated bus driver as Badar Ali Beg, 48. They took the injured, Abdul Motaleb, 26, to Khilgaon Police Station for interrogation. Motaleb, who suffered burns on his neck and back of his head, told The Daily Star that the two were sleeping on the isle in the afternoon; Motaleb was closer to the doors. Excessive heat woke him up, and seeing fire and smoke, he jumped out of a window. All the doors were locked. For the moment, he had forgotten that Badar was inside, he said. None in the area could say how and by whom the bus was set on fire....”
    কোনও রকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াই আমরা বুঝতে পারি তথ্য, ভাষা ও উপস্থাপনের দিক থেকে প্রকাশিত খবর চারটির শুরু চার রকম। আহরিত ও পরিবেশিত তথ্য প্রায় একই রকম। গাড়িচালকের নাম ও বয়স দু’টি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ভিন্ন। একটি পত্রিকায় আহত আবদুল মোতালেব অনুল্লিখিত। একটি পত্রিকায় স্থানটি সুনির্দিষ্ট করা হয় নি, অন্যান্য পত্রিকায় সুনির্দিষ্ট করা হলেও ভিন্নতা রয়েছে। একটি খবরে প্রাক-হরতাল বিষয়টির উল্লেখ নেই। অগ্নিসংযোগকারীরা দু’টি পত্রিকায় ‘দুর্বৃত্ত’ হিসেবে উল্লিখিত হলেও একটি পত্রিকায় তাদের উল্লেখ করা হয়েছে স্রেফ ‘যুবক’ হিসেবে। উপস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি পত্রিকায় বাসচালকের জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে অন্যান্য পত্রিকায় গুরুত্ব পেয়েছে রাজধানীর পরিস্থিতি ও হরতাল প্রসঙ্গ। কোনও উপস্থাপনায়ই মর্মান্তিক ঘটনাটির প্রকৃত বেদনা প্রকাশ পায় নি। ভাষায় ক্রিয়াপদের শুধু কথ্য রূপ দেখা যায়, কিন্তু শব্দচয়নে সাধু ভাষার মিশ্রণই বেশি। বাক্যগঠনেও প্রভাব বেশি সাধুরীতির। সংবাদশিল্পের জন্য আমাদের চাই - অল্প কথায় অধিক বলার দক্ষতা। চাই ছোট-ছোট শব্দে ছোট-ছোট বাক্য।
sazzadqadir@rediffmail.com

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১২

বলের বল বাহুবল

হরতাল আমি অপছন্দ করি। আরও অপছন্দ করি জ্বালাও পোড়াও ভাঙচুর। দেশের সম্পদ বিনষ্ট করা, জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি করা সমর্থন করি না মোটেও। যারা অতিউৎসাহে এসব কর্মকা-ে মাতে বা তৎপরতায় লিপ্ত হয় তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কোনও দোষ দেখি না আমি। পরাধীন দেশের সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আর স্বাধীন দেশের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন একই রকম হতে পারে না বলে বিশ্বাস করি। কিন্তু তাহলে সরকারের অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে তুলবে বিরোধী দল, কিভাবে লড়বে সরকারি দমন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে। ছোটবেলায়, সেই পঞ্চাশ-ষাট দশকে, দেখেছি - দেশে নিত্যপণ্য আক্রা হলে, খাদ্যাভাব দেখা দিলে ভুখ মিছিল বের করতো বিরোধী দল। এতে লজ্জা পেয়ে সরকার তাড়াতাড়ি খুলতো লঙ্গরখানা। না খুললে সরকারকে আরও লজ্জা দিতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকেই খোলা হতো লঙ্গরখানা। এখন তো লজ্জা-শরমের বালাই নেই কারও। ভুখ মিছিল তো দূরে থাক ভুখ হরতাল করলেও টনক নড়ে না সরকারের। সেকালে মাইকিং, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ব্যানার, পোসটার, ফেসটুন, দেয়াল লিখন, চিকা দেখলেই অস্থির হয়ে পড়তো প্রশাসন। এগুলো বন্ধ করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে শুরু করে দিতো ধরপাকড়। তারপর পত্রিকায় বিবৃতি, বিজ্ঞপ্তি দেখলে তো পত্রিকা ভরে যেতো প্রেসনোটে। সভা, সমাবেশ বন্ধ করতে ১৪৪ ধারা দিলেই চলতো তখন। এই আশির দশকেও এরশাদ লাগাতার কারফিউ দিয়ে রাখতেন। আর মিছিল? ভুখ মিছিলের কথা তো বলেছি, এছাড়া মশাল মিছিল ছিল তখন বিরোধী দলের বিশেষ প্রিয় কর্মসূচি। এখন তো লাঠি মিছিল, কাফনের কাপড় পরে মিছিল চলছে হরহামেশা। এ সবে ভ্রুক্ষেপ করে না সরকার। হরতাল, ধর্মঘট তো ধার হারিয়েছে কবে! অনশন ধর্মঘট ভারতে কাজে লাগলেও আমাদের এখানে অচল। শহিদ মিনারে শিক্ষকদের বা প্রেস ক্লাবের সামনে আয়াদের লাগাতার অনশন ধর্মঘট কোনও কাজ দিয়েছে বলে মনে হয় না। অবস্থান ধর্মঘট মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফরিকা, লাতিন আমেরিকায় ক্ষমতায় পালাবদল আনলেও এখানে সুযোগ পর্যন্ত মেলে না অবস্থানের। আর এখন যে ইউরোপ-আমেরিকায় দখল আন্দোলন (অকুপাই মুভমেন্ট) চলছে তা এখানে চালু করা অসম্ভব বললেই হয়। অথচ ষাটের দশকে ঘেরাও ছিল এক কার্যকর কর্মসূচি। মানববন্ধন, পদযাত্রা, সড়কযাত্রা, ট্রেনযাত্রা, শোভাযাত্রা, শোডাউন - এগুলো নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করলেও কোনও পাত্তা দেয় না সরকার। তাহলে কি করবে বিরোধী দল? সরকারি দলের লোকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দিলেও সে সব দেখার কেউ নেই। তারা হামলা হানাহানি করলে বরং বাহবা মেলে সরকারি মহলের। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি কোনও বোধোদয় ঘটায় না সরকারের, বরং তামাশার ব্যাপার বলেই ঠেকে সকলের কাছে। সেই কবে ‘পথের দাবী’ (১৯২৬) উপন্যাসে শরৎচন্দ্র লিখেছেন, “ধর্মঘট বলে একটা বস্তু আছে, কিন্তু নিরুপদ্রব ধর্মঘট বলে কোথাও কিছু নেই। সংসারে কোনও ধর্মঘটই কখনও সফল হয় না, যতক্ষণ না পিছনে তার বাহুবল থাকে। শেষ পরীক্ষা তাকেই দিতে হয়।” যে দেশে সদ্যবিদায়ী সরকারি দলকে আচ্ছামতো ছ্যাচা না দিলে নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করা যায় না সেখানে বলের বল বাহুবলই তো হয়ে থাকবে!
sazzadqadir@yahoo.com

রবিবার, ২২ এপ্রিল, ২০১২

সাযযাদ কাদির: ৬৫তম জন্মদিনে বিশেষ সাক্ষাৎকার

কবি সাযযাদ কাদির বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এক বহুদর্শী ব্যক্তিত্ব। সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তাঁর সৃষ্টিশীল বিচরণ বিস্ময় জাগায় পাঠকদের। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, সম্পাদনার কারণেও খ্যাতিমান তিনি।  সম্পাদনা প্রতিভা তাঁর অনন্য, রয়েছে সাংগঠনিক দক্ষতা। নিশ্ছিদ্র গভীর জ্ঞানের অনুসন্ধানে তিনি ব্রতী ও মনস্ক। ১৪ই এপ্রিল ১৯৪৭ সালে তাঁর জন্ম মাতুলালয় টাঙ্গাইল জেলা-শহরের উপকণ্ঠ-গ্রাম মিরের বেতকায়। পিত্রালয় একই জেলার দেলদুয়ার উপজেলা-সদরে। ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও এম এ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যথেচ্ছ ধ্রুপদ’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে, গল্পগ্রন্থ ‘চন্দনে মৃগপদচিহ্ন’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। কবিতা ও গল্প ছাড়াও উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ-গবেষণা, শিশুতোষ, সম্পাদনা, সঙ্কলন, অনুবাদ সহ বিভিন্ন বিষয়ে ৬০টির বেশি গ্রন্থের প্রণেতা সাযযাদ কাদিরের একাদশ কবিতাগ্রন্থ “বৃষ্টিবিলীন” প্রকাশিত হয়েছে গত অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। সাহিত্য সংস্কৃতি, সমকালীন প্রসঙ্গ সহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন ‘আমার দেশ’ সাহিত্য সাময়িকীর প্রতিনিধি কবি হাসান হাফিজ। কবি সাযযাদ কাদিরের ৬৫তম জন্মদিন উপলক্ষে সে আলোচনার উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো এখানে:

লেখালেখিতে কেমন করে এলেন?
ছোটবেলায় পড়তে শেখার পর শিখেছি লিখতে। পড়তে-পড়তে হয়েছিল পড়ার নেশা। আর লিখতে-লিখতে হয়েছে লেখালেখির নেশা। এ নেশা ফোর-ফাইভে পড়ার সময় থেকে। তখনই উৎসাহ-অনুপ্রেরণা পেয়েছি অনেকের কাছ থেকে। তাতে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে ক্রমে। একটু বড় হয়ে, মানে ক্লাশ এইটে পড়ার সময় থেকে, ঢাকার পত্রপত্রিকার শিশুকিশোর বিভাগে লেখা পাঠাতে থাকি। পদ্য, ছড়া, গল্প - এসব। পাঠিয়েছি, কিন্তু ভাবি নি তখনকার টাঙ্গাইলের মতো এক ঘোরতর মফস্বুলে গ্রাম-শহর থেকে পাঠানো এক বালকের লেখা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পাবে কোনও দিন। কিন্তু আমাকে ও আমার চেনাজানা সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে সব লেখা ছাপা হয়েছে ঠিকই। তবে শিশুতোষ লেখা লিখি নি বেশি দিন। ১৯৬২ সালে কলেজে ভর্তি হই অর্থাৎ সাবালক হয়ে উঠি। তখন ‘সাবালক’ কবিতা ও গল্প পাঠাতে থাকি পত্রপত্রিকায়। সেগুলো ছাপাও হতে থাকে। ফলে ওই সময় থেকেই আমি পরিচিত হয়ে উঠি লেখালেখির জগতে। তারপর এই ৫০ বছর ধরে আছি লেখার নেশাতেই। সেই সঙ্গে সেই পড়ার নেশা তো আছেই। আরও আছে দু’টি ঘোর নেশা - গান শোনা আর ছবি দেখা।
কবিতা ও গদ্য - কোন ধরনের রচনায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন? কেন?
লেখালেখির শুরু থেকেই চর্চা করে আসছি দু’টোরই। দীর্ঘ দিনের চর্চায় তো এক ধরনের অভ্যস্ততা, স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হয়ে যায়ই। সে স্বাচ্ছন্দ্য আছে আমার। তাছাড়া সব লেখাই আমি লিখি আগাগোড়া ভেবেচিন্তে। কোনও লেখার ভাবনা মাথায় এলে তা কোত্থেকে শুরু করে, কি-কি লিখে, কোথায় শেষ করবো - তা মনে-মনে ছকে নিই আগে। তারপর লিখতে বসি।
বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ রাজধানী হবে ঢাকা। অনেকের মতে, এই লক্ষণ ক্রমেই পরিস্ফুট হয়ে উঠছে। আপনার কি অভিমত?
এ রকম কথা বলা হচ্ছে সেই পঞ্চাশ-ষাট দশক থেকে। বায়ান্ন’র লড়াইয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আমরা সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছি চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমে। সে লড়াইয়ের রক্তঝরা পথ বেয়েই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ - আমাদের স্বাধীনতা। আমরা ভেবেছি, এই অর্জন আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে সর্বক্ষেত্রে। কিন্তু তা হয় নি। রাজনীতি দুর্নীতিগ্রস্ত, অর্থনীতি ভঙ্গুর, সমাজ কলুষিত। চল্লিশ বছর পরও অবক্ষয় সর্বত্র। সমাজপ্রগতি স্তব্ধ। এ অবস্থায় বিচ্ছিন্ন ভাবে কোনও মাধ্যম কি শীর্ষ সাফল্য পেতে পারে? চলচ্চিত্র, নাটক, টেলিভিশন, বেতার, সংগীত, চিত্রকলা, ক্রীড়া - কি অবস্থায় আছে? আমরা নতুন ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে চাই কিন্তু চারপাশে অনেক বাধা। ওদিকে কলকাতা চাইছে তাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে। ষাটের দশকে আমরা যেভাবে উরদুত্বকে মোকাবিলা করে বাংলাকে উঁচুতে রাখার সংগ্রাম করেছি, ওঁরা সেভাবেই হিন্দিত্বকে মোকাবিলা করে চলেছে, আর চ্যালেঞ্জ হিসেবে নতুন-নতুন ধারায় সৃষ্টিশীলতাকে অব্যাহত রাখছে। ওঁরা সমর্থন ও সাহস পাচ্ছে ওঁদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবেশ থেকে, কিন্তু এমন সমর্থন ও স্বাধীনতা এখানে কোথায়? এখানে বিভাজন, পরমতঅসহিষ্ণুতা, চরিত্রহনন ব্যাপক। দলীয়করণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মেধা, শ্রম, সততা আর যোগ্যতা বলে বিবেচিত হয় না; তাই সর্বোচ্চ শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানে চাকরি হয়ে যায় গাড়লদের, এবং তারা দিব্যি ছড়ি ঘুরিয়ে বেড়ায়। যেখানে কবিরা রাজকবি হয়ে ওঠে বা রাজকবি হতে চায় ্ল- সেখানে সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কি? কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা যখন ভিন্নমত পোষণের ও সমালোচনা করার অধিকার বিসর্জন দেয়, তখন দেশ জাতি জনগণের জন্য আর কিছু থাকে না তাদের। দেশ, রাজধানী - এ সব তো মানুষের। সেই মানুষের পক্ষে না থেকে যারা প্রতিষ্ঠার পোঁ ধরে তারা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে কোন গতিধারা আনবে? তবুও অবিশ্বাসী নই আমি। হতাশ নই। এই বৈরী সময়কে, অবক্ষয়কে চ্যালেঞ্জ করে সৃষ্টিশক্তির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটবেই এখানে। বিশাল বাংলা আজ কাঁটাতারের বেড়ায় ছিন্নভিন্ন, কিন্তু আমাদের মানসবাংলা অভিন্ন আকাশের নিচে হাজার বছরের এক পবিত্র ঐতিহ্যভূমি। এর ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্যকে কখনওই বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন করতে পারবে না কোনও রাষ্ট্রনীতি, কোনও কূটকচাল। তাই ঢাকা শুধু সাহিত্যের নয়, প্রতিটি বাঙালির মনে চিরজাগরূক সে বিশাল মানসবাংলা, তার রাজধানী হবে একদিন।
তারুণ্যের স্পর্ধিত বিকাশে লিটল ম্যাগাজিনগুলো আজকাল ঈপ্সিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না বলে কারও-কারও ধারণা। এ ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বলুন।
ষাটের দশকের লিটল ম্যাগাজিন চর্চায় আমি যুক্ত ছিলাম। আমার ভূমিকাও ছিল উল্লেখ করার মতো। ‘স্বাক্ষর’, ‘কণ্ঠস্বর’, ‘ছোটগল্প’ ও আরও অনেক ম্যাগাজিনে লিখেছি, কাজ করেছি। নিজে সম্পাদনা, প্রকাশনা করেছি। এগুলো ‘লিটল’ কেন তা বুঝি না। চালু হওয়া নাম ছাড়া আর কি? এগুলো সবই সাহিত্য পত্রিকা। সাহিত্যপত্র, কবিতাপত্র বা এ রকম কিছু। চালু বহু কিছু ঝেড়ে ফেললেও এই ‘চালু’ কথাটা যে কেন ঝাড়া গেল না এত দিনে তা বুঝি না। লিটল ম্যাগাজিনে লিখে আমি স্বস্তি পাই। তখনও পেয়েছি, এখনও পাই। আমি খুঁজে-খুঁজে সবচেয়ে বেশি কিনি ও পড়ি লিটল ম্যাগাজিন। আমার দরকারি বহু সম্পদ-সামগ্রী পাই এখানে। হারিয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া কত কি পেয়ে যাই! তাছাড়া নতুন রকম লেখা, নতুন ভাবে দেখা থাকে লিটল ম্যাগাজিনে। যখন দেখি চালুর ব্যাপারে দ্রোহ, আক্রমণ তখন বেশি ভাল লাগে। তবে সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার যে ধান্দাবাজি চলছে তা আরও খুলে দেখাতে পারতো তারা। প্রতিষ্ঠার প্রতিভূদের নানা মতলববাজি, অলেখকদের দৌরাত্ম্য, ভুয়াদের গ্রুপিং - এগুলো ন্যাংটো করে দেয়া দরকার। এ সব করতে গেলে অবশ্য নিজের ক্ষতি স্বীকারে প্রস্তুত থাকার সাহস থাকতে হবে।
সাহিত্যে গোষ্ঠীবদ্ধতা কতটা প্রয়োজন? সেটা কি ক্ষতিকর, না উপকারী? আপনার কি মনে হয়?
সাহিত্য আর যা-ই হোক দল বেঁধে, গোষ্ঠী গড়ে করা যায় না। কিন্তু প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠায় গোষ্ঠীবদ্ধতা ভূমিকা রাখে। এখন তো গোষ্ঠী-গ্রুপিং ছাড়া লেখা প্রকাশ করাই মুশকিল। মুখে গণতন্ত্রের পক্ষে, দলীয়করণের বিপক্ষে কথা বললেও বহু প্রকাশ-প্রচার মাধ্যমে কড়া দলবাজি চলছে। রীতিমতো কালো তালিকা তৈরি করে এক ধরনের ফাসিস্ত ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর। মুখ চিনে লেখা বা বই ছাপা হয়, অনুষ্ঠানে ডাকা হয়। এই গোষ্ঠী-গ্রুপিং অসুস্থ, অস্বাস্থ্যকর। এর মধ্যে সৃষ্টির চেয়ে বেশি আছে হননেচ্ছা। আমার নিজের অভিজ্ঞতা আছে এ ব্যাপারে। এক সাহিত্য সাময়িকীতে আমার লেখা ছাপা হয় না - আমি গাঞ্জুটি বা হেরোইনচি নই বলে। ওই সাময়িকী যিনি প্রযোজনা করেন তিনি নিজে একজন গাঞ্জুটি, তাই একই রকম পালকের পাখিদের সমাদর সেখানে।
কেমন বাংলাদেশ আপনি দেখতে চান?
আমি চেয়েছিলাম বাংলাদেশ হবে সমাজকল্যাণ রাষ্ট্র। সমাজে জীবনে থাকবে উদার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। এই কল্যাণরাষ্ট্র হবে “a concept of government in which the state plays a key role in the protection and promotion of the economic and social well-being of its citizens. It is based on the principles of equality of opportunity, equitable distribution of wealth, and public responsibility for those unable to avail themselves of the minimal provisions for a good life. The general term may cover a variety of forms of economic and social organization.”  মডেল হবে নোরডিক - সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের মতো। কিন্তু কি পেয়েছি? সকালে বা বিকালে শাহবাগে যাওয়ার পথে পরীবাগে দেখি ফুটপাতে অসহায় নরনারীশিশুর জীবন। কাওরানবাজারে আমার অফিস। রাতে বাসায় ফেরার পথে ভিআইপি রোডের ফুটপাতেও দেখি সেই দুঃস্থ নরনারীশিশুদের। দেখি প্রখর উজ্জ্বল আলোর নিচে কত নিকষ কালো অন্ধকার। গ্রীন রোডে থাকি। এ রোডেরও এখানে-ওখানে ফুটপাতে দেখি ওই নিঃসহায়দের। এই ভুখানাঙ্গা ছিন্নমূল মানুষকে দেখবো চারপাশে আর শুনবো ক্ষমতার রাজনীতির গলাফাটা চেঁচামেচি? না, এমন দেশ আমি চাই নি।

জলা-নালা জয়ের জন্য

দু’ দশকেরও বেশি হলো আমাদের দেশে দু’টি বড় রাজনৈতিক দল ক্ষমতা ভোগ করছে পালাক্রমে। পর-পর দু’বার ক্ষমতা ভোগের জন্য যৎপরোনাস্তি চেষ্টা চালালেও এখনও সফল হন নি তাঁরা। সম্ভবত যত বড় ভাবা হয় অত বড় দল নয় বলেই এমনটি ঘটে।  অত বড় নয় বলছি, কারণ ছোট-ছোট দলের সঙ্গে জোট গড়তে হয় তাঁদের। এছাড়া ছোটদের জোটে রাখাও জরুরি। নাহলে ছোটরা সব মিলেঝুলে বড় জোট গড়ে একদিন তারাও বড় দল হয়ে উঠতে পারে। সেটা ভাল হবে না দুই বড়’র জন্য। কিন্তু রাজনীতির নামে এই দুই বড় পরস্পরের প্রতি যে রকম মারমুখো তাতে পরিস্থিতি সেদিকেই যাবে শিগগিরই - এমন মনে করার কারণ আছে যথেষ্ট। তাদের বেপরোয়া বিরোধিতা সব ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিয়েছে নেতিবাচক মনোভাব, সন্দেহ, অবিশ্বাস, অসষ্ণিুতা, আক্রোশ, ঘৃণা। আর এসব সূত্রে দেখা দিচ্ছে সহিংসতা। জ্বালাও পোড়াও ভাঙচুর হানাহানি সংঘাত সংঘর্ষ হামলা মামলা হরতাল ধর্মঘট। গরিব দেশের জন্য এ সব চরম বিলাসিতা। দু’দলের নেতাকর্মীদের অহমিকা অনাচার দুরাচার প্রতিশোধ প্রতিহিংসার জন্য দেশের সম্পদ বিনষ্ট হবে, প্রশাসন ব্যতিব্যস্ত থাকবে, ব্যবসা বাণিজ্য শিক্ষা সহ সকল আর্থসামাজিক কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়বে - আর কত দিন দেশ জাতি জনগণের এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি নিত্য সইবে মানুষ? ভারতচন্দ্রের ভাষায় বলি, “নিত্য তুমি খেলো যাহা। নিত্য ভাল নহে তাহা ॥”
    দু’ দলের সর্বশেষ খেলা এখন চলছে সাগরের জয়-পরাজয় নিয়ে। সরকার বলছে, মিয়ানমারের সঙ্গে সাগরসীমা সংক্রান্ত বিরোধে আন্তর্জাতিক আদালত যে রায় দিয়েছে তা বাংলাদেশের পক্ষে এসেছে। এ জয় বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় উদযাপন করছে সরকারি দল। অভিনন্দন, সংবর্ধনা, অভ্যর্থনা চলছে। অভিনন্দন প্রথমে বিরোধী দলও জানিয়েছিল, পরে প্রত্যাহার করে নিয়ে বলেছে, এটা বিজয় নয়... শুভঙ্করের ফাঁকি। বিজয় হলে মিয়ানমার-ও কেন উৎসব করছে? পত্রপত্রিকায় নানা তথ্য-উপাত্ত আসছে এ সব নিয়ে। সরকারের প্রতি আমার অভিনন্দন প্রত্যাহার করি নি আমি, কিন্তু বুঝতে পারছি না ঘটনা কি। দু’দল এভাবেই আমাকে, আমার মতো অনেককে, দেশবাসীকে বিমূঢ় বিভ্রান্ত করে রাখে প্রায় সব বিষয়েই। তাঁরা পরস্পর সম্পর্কে যে সব কথা বলেন সে সব বিশ্বাস করলে বলতে হয় - আমরা এক ভয়ঙ্কর সময়ে বাস করছি ভয়ঙ্কর লোকজনের সঙ্গে।
    যাহোক, সাগরে আমাদের জয়-পরাজয় নিয়ে খোঁজাখুঁজি করি সংবাদমাধ্যমে। নানা প্রতিবেদন, মন্তব্য, মতামত পড়ি। মিয়ানমারের অনলাইন সংবাদপত্র দি ইরাবতী’র গত ১৫ই মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত জোসেফ আলচিন-এর প্রতিবেদন “বাংলাদেশ ক্লেইমস্‌ ভিক্টরি ইন বে অভ বেঙ্গল ডিসপিউট”  (www2.irrawaddy.org.article.php)-এর নিচে মতামত অংশে জনৈক Andy’র একটি মন্তব্য পাই এরকম:“ Bengali claimed purportedly victory because of their own political reason at home. They are just being jactitation. Actually they didn't even win what they had asked for. ITOLS awarded 171,832 square kilometres to Myanmar whereas it allocated approximately 111,631 square kilometres of the relevant area to Bangladesh. Bangla may have won their disputed deep sea block 11 but Myanmar will still retain Bangla's drawn up gas-field blocks 18, 22, 23, 27 and 28.” কৌতূহলী পাঠক-পাঠিকাদের জন্য এ সংক্রান্ত দু’টি লিঙ্ক দিচ্ছি এখানে। আপনারা নিজেরাও দেখে নিতে পারেন - http://horizonspeaks.wordpress.com/2011/09/11/bangladesh-vs-myanmar-the-maritime-arbitration/; http://internationallawobserver.eu/2012/03/15/judgment-in-bangladesh-myanmar-maritime-boundary-dispute/.
    এ থেকে জানতে পারছি - বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ এলাকার ১১১,৬৩১ বর্গকিলোমিটার অংশ বণ্টন করা হয়েছে বাংলাদেশকে, আর ১৭১,৮৩২ কিলোমিটার অংশের মালিকানা মিয়ানমারের বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। গভীর সাগরের ব্লক ১১ নিয়ে বিরোধে বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে, কিন্তু দাবিকৃত ১৮, ২২, ২৩, ২৭ ও ২৮ ব্লক পায় নি। ওগুলোর মালিকানা রয়ে গেছে মিয়ানমারেরই। আমার এবং আমার মতো বহুজনের প্রশ্ন, আসল ঘটনা কি এটাই? বিষয়টি পরিস্কার করতে পারেন শুধু বিশেষজ্ঞ ও বিশারদগণ। তাঁরা নিশ্চয়ই এগিয়ে আসবেন তাঁদের দায়িত্ব পালনে।
    তবে সাগর জয়ের খবর পেয়ে প্রথমে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এ জয়ের ফল ভোগ করবে কে? বিদেশী তেল-গ্যাস কোমপানি, দেশী ধনিক ব্যবসায়ী ও আমলাচক্রের বেষ্টনী চুঁইয়ে কি কিছু আসতে পারবে জনমানুষের কাছে? সাগর দূরে থাক, আমাদের নিজেদের নদীনালা খালবিল-ই তো জয় করতে পারছি না আমরা। বাঁধ ও বণ্টনের মধ্যে আমরা হারিয়েছি গঙ্গা নদীকে। তাই পদ্মা আজ পরাজিত। এক শ’ বছর আগে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২) তাঁর ‘কুহু ও কেকা’ (১৯১১) কাব্যে ‘পদ্মার প্রতি’ নামে যে কবিতাটি লিখেছিলেন তা আজ অবিশ্বাস্য, হয়তো হাস্যকরও, মনে হবে এ প্রজন্মের অনেকের কাছে। তিনি লিখেছিলেন -
    “হে পদ্মা! প্রলয়ঙ্করী! হে ভীষণা! ভৈরবী সুন্দরী!
    হে প্রগল্‌ভা! হে প্রবলা! সমুদ্রের যোগ্য সহচরী
    তুমি শুধু; নিবিড় আগ্রহ তার পার গো সহিতে
    একা তুমি; সাগরের প্রিয়তমা অয়ি দুর্বিনীতে!
    দিগন্ত-বিস্তৃত তব হাস্যের কল্লোল তারি মত
    চলিয়াছে তরঙ্গিয়া, - চিরদৃপ্ত, চির-অব্যাহত।
    দুর্দমিত, অসংযত, গূঢ়চারী, গহন-গম্ভীর,
    সীমাহীন অবজ্ঞায় ভাঙিয়া চলেছ উভতীর!...”
    তিস্তা ও ফেনী নদী নিয়ে চলেছে এক অনিশ্চিত প্রক্রিয়া। ওদিকে টিপাইমুখে বাঁধ হুমকি হয়ে উঠেছে সুরমা ও কুশিয়ারা’র জন্য। বাঁধ নির্মিত হতে যাচ্ছে মেঘালয়ে। সবার উপরে ৩৮টি নদ-নদীর মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে এবং ছোট-বড় ৩৪টি বাঁধ ও ৭৮টি বড় জলাধার নির্মাণের মাধ্যমে প্রতিবেশী ভারত যে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে তাতে কোন সর্বনাশ নেমে আসবে আমাদের ওপর তা কি জানি এখনও? অভিজ্ঞ মহল বলছেন, এতে এ দেশের নদী-ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটবে, মরুকরণ শুরু হবে ব্যাপক মাত্রায়, সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে, প্রতিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে চরম আকারে।
    এ তো প্রতিবেশীদের ব্যাপারস্যাপার। দেশের ভেতরকার নদ-নদীর অবস্থা কি? রাজধানীর ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর অবস্থা কি? ঢাকার ভেতরকার খাল-নালাগুলো এখন কোথায়? আশপাশের জলাভূমিগুলো কোথায়? দু’ বছরেরও আগে, ২০০৯ সালের ৮ই এপ্রিল, পরিবেশন দূষণ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে যা উল্লেখ করা হয়েছিল এখনও তা সত্য হয়ে আছে হুবহু। এই দু’ বছরে সরকার অনেক কিছু করেছে, আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে ভূমিকাও রেখেছে ? কিন্তু উন্নতি হয়েছে কতখানি কি? প্রতিবেদনটি এ রকম:“The government over the years has allowed industrialists to pollute the rivers, canals and wetlands in and around the city  to such an extent that surface water turned pitch black in several spots. Pollution has set in on the Buriganga, Shitalakhya and Balu rivers and made it almost impossible to treat the water. The water and Sewerage Authority  (wasa), is supplying stinky water by purifying it with cholorine ammonia sulfate. But most of the industrialists have defeid the directive and the government also did not take action against any of the violators. Even the Department of Environment (DoE) does not know much about it. Besides industry generated liquid and solid waste, most of the human excreta directly goes down the rivers through underground pipelines as nearly 70 percent houses are not connected to the excrete treatment plant. Waste from these industries is connected with the sewerage system that directly goes into tha rivers around the city. In fact, the rivers have become a dumping ground of all kinds of solid, liquid, and chemical waste of bank side population.”
    আমরা সাগর জয় করেছি, কিন্তু এই সব ছোট-ছোট জলা-নালার কাছে হেরে বসে আছি কেন? যখন একের পর এক নদী মরছে, খাল-বিল ভরাট হয়ে যাচ্ছে, আর আমরা কিচ্ছু করতে না পেরে কেবল তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছি, তখন উৎসাহ পাই না কোনও সাগরজয়ের উৎসবে। কেউ কি পান?

sazzadqadir@gmail.com; sazzadqadir@rediffmail.com; sazzadqadir@yahoo.com; facebook.com/sazpa85

সংবাদশিল্পের সন্ধানে

সংবাদ আমাদের সবসময়ের সঙ্গী। আমরা নিঃশ্বাস নেই সংবাদে, আমরা বাঁচিও সংবাদে। আমাদের জীবন-সংসার চলন বলন ভাবনা সবই সংবাদময়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত অসংখ্য সংবাদে ডুবে থাকি আমরা সবাই। আমাদের আবেগ আগ্রহ আকাঙক্ষা সবই সংবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের সকলের দেখা শোনা চেনা জানা, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যা কিছু সবই সংবাদবিজড়িত। যখন কথা বলি বা শুনি - সামনাসামনি বা সেলফোন-টেলিফোনে তখনও আদানপ্রদান করি সংবাদের। তারপর আছে কত শত সংবাদমাধ্যম। রেডিও, টেলিভিশন, ইনটারনেট, সেলফোন, সংবাদপত্র। বাংলাদেশী শ্রোতাদের জন্য সংবাদবিশ্ব উন্মুক্ত হয়ে গেছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রসারের সঙ্গে-সঙ্গে। রেডিওতে, এফএম ব্যান্ডে সারা দিনই খবর দেশী-বিদেশী নানা চ্যানেল থেকে। টেলিভিশনেও দেশী-বিদেশী অসংখ্য চ্যানেলে ঘণ্টায়-ঘণ্টায় পরিবেশিত হয় সংবাদ। আর আছে আমাদের দুই শতাব্দী প্রাচীন বিশ্বস্ত সঙ্গী সংবাদপত্র। অডিও-ভিসুয়াল মাধ্যমগুলোর বৈপ্লবিক উৎকর্ষে অনেকেই আশঙ্কা করেছেন, এর আকর্ষণ বুঝি যায়-যায়। কিন্তু সে সব আশঙ্কা অমূলকই প্রমাণিত হয়েছে। সংবাদপত্র স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে আছে এখনও। তাই আমরা সংবাদপত্রের চোখ দিয়ে দেখি, তার কান দিয়ে শুনি, তার বিবরণ থেকে বুঝি, এমনকি কথা বলি ও লিখি তার ভাষায়ই। সংবাদপত্রের আকর্ষণ কতখানি তা একটু মজা করেই লিখেছেন প্রখ্যাত মারকিন সাংবাদিক-সাহিত্যিক হেলেন রাওল্যান্ড (১৮৭৫-১৯৫০) -“Before marriage, a man declares that he would lay down his life to serve you; after marriage, he won't even lay down his newspaper to talk to you.”
    এমন তীব্র আকর্ষণের কারণ সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্য প্রভৃতির মতো সংবাদও এক শিল্প। সাহিত্যে যেমন ভাব ভাষা নির্মাণ, সংবাদেও তেমন তথ্য ভাষা উপস্থাপন। এ তিনটি ক্ষেত্রে যিনি যত শিল্পিত তিনি তত কৃতী সাহিত্যিক বা সাংবাদিক। সমস্যা একটিই। সেটা বলেছেন বৃটিশ কবি-সমালোচক ম্যাথু আরনল্ড (১৮২২-১৮৮৮) - "Journalism is literature in a hurry." এই চটজলদি কাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সংবাদশিল্প নির্মাণ সহজ নয় কোনও সাংবাদিকেরই পক্ষে। তবে ওই মোকাবেলাটাও এক শিল্প। সে পথে দুই শতকে অনেকখানি পথ হেঁটে এসেছে সংবাদপত্র। তবে আরও পথ হাঁটতে হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এখন সে হাঁটা-চলা কেমন তা একটু সন্ধান করা যেতে পারে।
    গত ২১শে এপ্রিল একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দিলে চালক পুড়ে মারা যান - এ খবরটি পরদিনের এক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে এভাবে:
    “আট বাসে আগুন / চালক জীবন্ত দগ্ধ... বিএনপির সকাল-সন্ধ্যা হরতালের আগের দিন দুর্বৃত্তরা রাজধানীর খিলগাঁও, গুলিস্তান, আবদুল্লাহপুর, আজিমপুর, ভিক্টোরিয়া পার্ক, মিরপুর ও ফার্মগেট এলাকায় ৮টি বাস আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। এ ঘটনাগুলোর মধ্যে খিলগাঁও খিদমাহ হাসপাতালের সামনে বদর আলী বেগ (৪০) নামের এক চালক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। নিহত বদর আলী ঈগল পরিবহনের একটি বাসের চালক ছিলেন। এছাড়া এসব ঘটনায় ৪জন আহত হয়েছেন। তবে বাসগুলোতে কারা কীভাবে আগুন দিয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে তা জানাতে পারে নি পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। বাস ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালানোর অভিযোগে ৮জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া হরতালের সমর্থনে গতকাল বিকালে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় মিছিল বের করেছে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এদিকে বিভিন্নস্থানে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রায় যানবাহনশূন্য হয়ে পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাড়ি ফেরা সাধারণ মানুষ। উল্লেখ্য, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীকে ‘গুম’ করেছে - এমন অভিযোগে বিএনপি রবিবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে।...”
    অন্য এক পত্রিকায় উপস্থাপনা এ রকম:
    “রাজধানীতে ৬ যানবাহনে আগুন / ১ জন নিহত... গতকাল শনিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর ছয়টি স্থানে ছয়টি বাস-মাইক্রোবাসে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়ার ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম বদর আলী (৪০)। তিনি বাসচালক। গতকাল দুপুর ২টার দিকে খিলগাঁও, আজিমপুর, গুলিস্তান ও উত্তরার আবদুল্লাহপুরে চারটি বাসে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ফকিরাপুলে আগুন দেয়া হয় সরকারি জনপ্রশাসনের এক মাইক্রোবাসে। এর আগে দুপুরে খিলগাঁওয়ে ঈগল পরিবহণের বাসে দেয়া আগুনে বাসটির চালক বদর আলী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান এবং হেলপার মোতালেব আহত হন। ঈগলের বাসটি (যশোর-ব-১১-০০১৯) ঢাকা-খুলনা রুটের। খিদমা হাসপাতালের সামনে ওই বাসটিকে আগুন ধরিয়ে দেয় কয়েকজন যুবক। এ গাড়ির ভেতর থেকেই উদ্ধার করা হয় গাড়িচালক বদরের মৃতদেহ।...”
    অন্য আরেক পত্রিকায় খবরটি এসেছে এভাবে:
    “বাসে আগুন, দগ্ধ হয়ে চালক নিহত... রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় গতকাল দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত আটটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে একটি বাসের চালক নিহত হয়েছেন। দুপুর থেকে একের পর এক বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর রাজধানীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হতে শুরু করে। বিশেষ করে রাস্তায় দুপুরের পর থেকে যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যা কমে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় অফিস ফেরত নগরবাসীকে। গতকাল দুপুরের পর থেকে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়িও কম দেখা গেছে। দুপুরে ।াধ ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি বাসে দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করে। এর মধ্যে খিলগাঁও গভর্নমেন্ট কলোনির সামনে পার্কিং করা বাসে আগুন লাগিয়ে দেয়ায় চালক বদর উদ্দিন (৪০) অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ওই বাসের চালকের সহকারী আবদুল মোতালেব। কে বা কারা কি কারণে বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে, তা নিশ্চিত জানা যায় নি। তবে পুলিশ দাবি করছে, বিএনপি’র ডাকা হরতালকে কেন্দ্র করেই বাসে আগুন লাগিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।...”
    ইংরেজি একটি পত্রিকায় খবরটি এ রকম:
   “Bus was parked, driver asleep... A driver was burned to death and his assistant suffered injuries as their bus was set alight at the capital's Khilgaon yesterday on the eve of the opposition-called hartal. Nine more buses, including three with passengers, were torched at Mirpur-1 and 10, Baridhara, Azimpur, Abdullahpur Beribadh, Gulistan, Darus Salam, Farmgate and near Bahadur Shah Park, fire brigade officials said. The latest was around 8:15pm. Police identified the ill-fated bus driver as Badar Ali Beg, 48. They took the injured, Abdul Motaleb, 26, to Khilgaon Police Station for interrogation. Motaleb, who suffered burns on his neck and back of his head, told The Daily Star that the two were sleeping on the isle in the afternoon; Motaleb was closer to the doors. Excessive heat woke him up, and seeing fire and smoke, he jumped out of a window. All the doors were locked. For the moment, he had forgotten that Badar was inside, he said. None in the area could say how and by whom the bus was set on fire....”
    কোনও রকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াই আমরা বুঝতে পারি তথ্য, ভাষা ও উপস্থাপনের দিক থেকে প্রকাশিত খবর চারটির শুরু চার রকম। আহরিত ও পরিবেশিত তথ্য প্রায় একই রকম। গাড়িচালকের নাম ও বয়স দু’টি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ভিন্ন। একটি পত্রিকায় আহত আবদুল মোতালেব অনুল্লিখিত। একটি পত্রিকায় স্থানটি সুনির্দিষ্ট করা হয় নি, অন্যান্য পত্রিকায় সুনির্দিষ্ট করা হলেও ভিন্নতা রয়েছে। একটি খবরে প্রাক-হরতাল বিষয়টির উল্লেখ নেই। অগ্নিসংযোগকারীরা দু’টি পত্রিকায় ‘দুর্বৃত্ত’ হিসেবে উল্লিখিত হলেও একটি পত্রিকায় তাদের উল্লেখ করা হয়েছে স্রেফ ‘যুবক’ হিসেবে। উপস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি পত্রিকায় বাসচালকের জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে অন্যান্য পত্রিকায় গুরুত্ব পেয়েছে রাজধানীর পরিস্থিতি ও হরতাল প্রসঙ্গ। কোনও উপস্থাপনায়ই মর্মান্তিক ঘটনাটির প্রকৃত বেদনা প্রকাশ পায় নি। ভাষায় ক্রিয়াপদের শুধু কথ্য রূপ দেখা যায়, কিন্তু শব্দচয়নে সাধু ভাষার মিশ্রণই বেশি। বাক্যগঠনেও প্রভাব বেশি সাধুরীতির। সংবাদশিল্পের জন্য আমাদের চাই - অল্প কথায় অধিক বলার দক্ষতা। চাই ছোট-ছোট শব্দে ছোট-ছোট বাক্য।
sazzadqadir@rediffmail.com

বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১২

পা পিছলে আলুর দম

‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে / তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে’ - রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’ (১৯০১) কাব্যগ্রন্থের ৭০ সংখ্যক কবিতার এই দু’টি পঙ্‌ক্তি সম্ভবত সর্বাধিক উল্লিখিত বাংলা কবিতাংশগুলোর একটি। এ কথারই প্রতিধ্বনি মেলে আরেকটি উদ্ধৃতিতে - ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত’। গত শতকের ষাটের দশকে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের স্লোগান ছিল এ উদ্ধৃতিটি। তখন পোসটারে, ব্যানারে, দেয়াল লিখনে দেখা যেতো এ বিদ্রোহের আহবান। শুনেছিলাম উদ্ধৃতিটি চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও চ্যতোং (১৮৯৩-১৯৭৬)-এর। আরেকটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি মারকিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (১৭৪৩-১৮২৬)-এর - “If a law is unjust, a man is not only right to disobey it, he is obligated to do so.”
গত ৯ই এপ্রিল রাতে পিলখানায় ৭০ লাখ টাকা নিয়ে যে ঘনঘোর নাটকের অবতারণা হয় তাতে এ সব উদ্ধৃতি মনে পড়ছিল বারবার। উদ্ভূত নাটকীয় ঘটনাই প্রমাণ করে ওই টাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক অন্যায়। সে প্রমাণ পেয়েই অনুসন্ধানে নামে মিডিয়া। আর খুব দ্রুত বেরিয়ে পড়ে থলের কালো বিড়াল। দেখা যায়  ‘রেলগাড়ি ঝমাঝম... পা পিছলে আলুর দম’ গোছের এক কাহিনী। রেলের ট্রেড অ্যাপ্রেনটিস পদে ১৬ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের এক অংশ ওই ৭০ লাখ টাকা। সে অন্যায়ে বহু পক্ষ জড়িত। নিয়োগদাতা, নিয়োগপ্রার্থী, তদবিরকারী, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও আছেন তাঁরা - যাঁদের না দিয়েথুয়ে বড় দাঁও মেরে  ভূরিভোজ করা যায় না।
     রেল নতুন মন্ত্রণালয়। তাই বলে দুর্নীতির ব্যাপারস্যাপার নতুন নয় এখানে। এ মন্ত্রণালয় আগে ছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অংশ। তখন দুর্নীতি সংক্রান্ত ঘাপলা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যন্ত জানাজানি হওয়ায় পদ্মা সেতুর নির্মাণ হয়ে যায় অনিশ্চিত। এর আগে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপার নিয়ে ঘটে নানা তুলকালাম। এক দুর্ঘটনায় দু’জন খ্যাতিমান ব্যক্তির প্রাণহানির সূত্রে মিডিয়ায় আসে তাদের সে সব কর্মকা-ের ফিরিস্তি। তবে এসব কি কেবল রেলে বা যোগাযোগে চলছে? অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে এদিক-সেদিক কিছু নেই?
    উপন্যাসের পাঠকরা বা টিভি-নাটকের দর্শকরা জানেন, এখন সবচেয়ে ভাল ফরমুলা হচ্ছে - অস্বাভাবিক লোকজনদের নিয়ে উপন্যাস-নাটক লেখা। নায়ক-নায়িকা, মা-বাবা থেকে কাজের লোক বা বুয়া সবাই কথাবার্তা বলবে অদ্ভুত-অদ্ভুত, কাজকর্ম করবে আরও অদ্ভুত-অদ্ভুত অর্থাৎ উপন্যাস বা নাটকের সকল চরিত্রকে চলনে বলনে হতে হবে পাগলা বা পাগলাটে। তাহলেই উপন্যাস হট কেক, টিভি নাটক সুপার হিট। এ রকম হট বা হিট করার ফরমুলা আগেও ছিল। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন - ‘পল্লীসমাজ’-এ সবাই খারাপ, কেবল ‘রমা’ ও ‘রমেশ’ ভাল। কথাটির অর্থ, উপন্যাসে শরৎচন্দ্র  সমাজের শতেক দোষ-ত্রুটি দেখালেও নায়ক ও নায়িকাকে রাখতেন প্রায় দেবোপম নিষ্কলঙ্ক। বাস্তবে এমন তো হতে পারে না। কোনও সমাজে মাত্র দু’জন ভাল লোক থাকতে পারে না, যদি ৯৮ জন মানুষ খারাপ হয়। সে রকম কেবল রেল-যোগাযোগ খারাপ আর বাকি সকল মন্ত্রণালয় ভাল - এমন হতে পারে কি? কিন্তু সবার উপরে রাজনীতি। তাই বলছি, সকল শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে ৭০ লাখ হতে পারে সাদা বিড়াল। সে ম্যাঁও শোনা গেছে এরই মধ্যে। আমার প্রিয় কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেই কবে লিখেছেন - “রূপসী তুই রাজনীতি, দিস্‌ ছেলে-ছোকরাদের মাথা ঘুরিয়ে; কিন্তু বুড়ো শয়তানদের সঙ্গে থাকিস্‌ রাত্রে শুয়ে।” তাহলে এই নোংরা রাজনীতি ঠেকাবার উপায় কি? একটাই উপায়। বাঁচার রাজনীতি।
sazzadqadir@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ১২ এপ্রিল, ২০১২

কোটি-কোটি কাঠখরচ

ম্যাটরিকুলেশন, সংক্ষেপে ‘ম্যাটরিক’, পরীক্ষা চালু করেছিল ব্রিটিশ রাজ, এর সমাপ্তি ঘটে ১৯৬২ সালে। আমার মনে আছে, কারণ এ পরীক্ষা আমি দিয়েছিলাম ওই বছর। এর পর, ১৯৬৩ সাল থেকে, চালু হয় সেকেন্ডারি স্কুল সারটিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা। কেটে গেছে প্রায় ৫০ বছর, কিন্তু এখনও সবার মুখে-মুখে চালু আছে ম্যাটরিক পরীক্ষা, এসএসসি কথাটা আর মুখে আসে না কারও। এ রকম অনেক কিছুই বদলে গেছে, কিন্তু আগেরটাই আঁকড়ে ধরে আছি আমরা। নতুনের প্রতি নেতি আর পুরনোর প্রতি প্রীতি কি আমাদের জাতীয় রক্ষণশীলতারই এক বৈশিষ্ট্য? মারকিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম প্রেসিডেন্ট (১৯৩৩-১৯৪৫) ফ্রাঙ্কলিন ডিলানো রুজভেল্ট (১৮৮২-১৯৪৫) বলেছেন, রক্ষণশীলদের পা দু’টো থাকে চমৎকার ? তবে তারা সামনের দিকে চলা শেখে না কখনও। সম্ভবত এ জন্যই ভাষা-ভাষা বলে প্রাণ দিলেও বানান শিখি না, শেখার চেষ্টাও করি না। প্রমিত বানান তো নয়ই। ও সব জানতেও চাই না। ‘ঘুষ’ বানানটি যে ‘ঘুস’ হওয়া উচিত তা বলা হয়েছে অনেক আগে। হিন্দি ‘ঘুস’ থেকে আসা এ অ-তৎসম বিদেশী শব্দের বানান বাংলায় ‘ঘুস’ হওয়ারই কথা। বাংলা একাডেমীর ‘বাংলা বানান-অভিধান’ (পুনর্মুদ্রণ, ১৯৯৫) এ বানানটিই নির্দেশ করেছে, কোনও বিকল্প দেয় নি। তবে ঘুষের সঙ্গে ঘুষাঘুষির একটা ব্যাপার আছে বলেই হয়তো হিন্দি ‘ঘুস’ বাংলায় হয়ে গেছে ‘ঘুষ’। তবে ওই অভিধানে ‘ঘুষি’ ও ‘ঘুষাঘুষি’ও  বিকল্পহীন ‘ঘুসি’ ও ‘ঘুসাঘুসি’। তবে বানান যা-ই হোক ঘুষের অনেক কদর সমাজে। ভাষাতেও। তাই কত নামে ঘুষকে ডাকি আমরা ? উৎকোচ, উপরি, বখশিশ, সেলামি, টু-পাইস, হাতটান, লেনদেন, বাঁ হাতের কামাই, খুশি করা, প্রণোদনা, নজরানা, রিসওয়াত, গোপন পারিতোষিক, গেটিস...! ইংরেজদের কাছেও এর কদর অনেক। ওদের ভাষাতেও অনেক নাম ? " tip, gift, sop, perk, skim, favor, discount, waived fee/ticket, free food, free ad, free trip, free tickets, sweetheart deal, kickback/payback, funding, inflated sale of an object or property, lucrative contract, donation, campaign contribution, fundraiser, sponsorship/backing, higher paying job, stock options, secret commission, or promotion (rise of position/rank)...! "আরও অনেক রকম ঘুষ আছে। মারকিন নাট্যকার থর্নটন ওয়াইল্ডার (১৮৯৭-১৯৭৫) বলেছেন, বিয়েটাও ঘুষ। এ ঘুষ পেলে বাঁদী নিজেকে বেগম ভাবে।
    তবে ঘুষ নিয়ে সামপ্রতিক এক ঘুষাঘুষি জাতীয় ঘটনার খবর জেনেই এত সব কথা বললাম। রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুক তালুকদারের গাড়ি থেকে ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার হয়েছে গাড়িচালক আলী আজমের আকস্মিক তৎপরতায়। গাড়িতে আরও ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের জিএম ইউসুফ আলী মৃধা ও রেলওয়ে পুলিশের কমান্ডেন্ট এনামুল হক। ১৬ কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্যের একটা ভাগ ওই টাকা। ধরা পড়ার পর ঘুষের টাকা ভাগ-বাটোয়ারার নানা কাহিনী ফাঁস হয়ে পড়ছে মিডিয়ায়।  এ দেশে এ সব ওপেন সিকরেট। তারপরও এমন ঘটনা যে কেন ঘটে! আসলে ঘুষ জিনিসটা দিয়ে-থুয়ে খাওয়াই ভাল। তা করলে গাড়িচালক আজমকে হজম করা কঠিন হতো না কিছু। রাজনীতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এখন। নেতা হতে, মন্ত্রী-এমপি হতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় মানে কাঠখরচ করতে হয়। দলের সদস্য হওয়া, তারপর পদ পাওয়া, নির্বাচনে মনোনয়ন জোটানো, জিতে এমপি হওয়া, মন্ত্রীত্ব বাগানো ? এগুলো সহজ কম্ম নয়। কোটি-কোটি-কোটি কাঠখরচ। সেগুলো আসে কোত্থেকে? আসবে কোত্থেকে? রাজনীতিতে টাকা তো এভাবেই আসে। আর কোনও ভাবে আসে নাকি?

sazzadqadir@rediffmail.com